চট্টগ্রাম বন্দর
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে রাখা আমদানি-রপ্তানি পণ্যভর্তি কন্টেইনার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ‘অ্যাক্ট অব গড’ উল্লেখ করে এ ক্ষয়ক্ষতির দায় নেবে না বলে জানিয়েছে। ফলে ক্ষতির দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার— বন্দর কর্তৃপক্ষ, শিপিং লাইন নাকি বীমা কোম্পানির; তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
১০ জুলাই জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে সংরক্ষিত পণ্য, কার্গো ও কন্টেইনারের কোনো ক্ষয়ক্ষতির জন্য তারা দায়ী থাকবে না। সংস্থাটির দাবি, এটি ‘অ্যাক্ট অব গড’ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ঘটনা। তবে শিপিং লাইনগুলো বলছে, কন্টেইনার নিরাপদে বন্দরে হস্তান্তর এবং বিল অব লেডিং-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর বন্দরে অবস্থানরত পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির দায় তাদের ওপর বর্তায় না। অন্যদিকে বীমা কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট বীমা নীতিমালার (ইনস্যুরেন্স কভারেজ) শর্তের ওপর। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত আমদানি-রপ্তানিকারকদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, বীমা দাবি গ্রহণ না হলে ক্ষতির পুরো আর্থিক বোঝা তাদেরই বহন করতে হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যেহেতু পণ্যগুলো বন্দরের হেফাজতে ছিল, তাই প্রাথমিকভাবে দায় নির্ধারণের বিষয়টি বন্দরের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ দায় অস্বীকার করলে ক্ষয়ক্ষতির কারণ সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। সেই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই বীমা দাবি নিষ্পত্তির বিষয়টি নির্ধারিত হতে পারে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন মো. সালাউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ব্যাংকে জমা রাখা টাকা যদি পানিতে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে দায় যেমন ব্যাংকের, তেমনি বন্দরে সংরক্ষিত পণ্যের নিরাপত্তার দায়িত্বও বন্দরের। বন্দরের হেফাজতে থাকা কার্গো ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই”।
তিনি আরও বলেন, সব ধরনের নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত মান নিশ্চিত থাকার পরও যদি অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়, তখন সেটিকে ‘অ্যাক্ট অব গড’ বলা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে ইয়ার্ডের ড্রেনেজ, সুরক্ষা ব্যবস্থা ও মানদণ্ড যথাযথ ছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। এরপরই বীমা কভারেজের বিষয়টি বিবেচনায় আসবে।
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে গত সোমবার থেকে চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টি শুরু হয়। টানা বর্ষণের তৃতীয় দিনে বন্দরের বিভিন্ন ইয়ার্ডে হাঁটুপানি জমে যায়। এতে কন্টেইনারে পানি ঢুকে আমদানি-রপ্তানি পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১০ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়মুক্তির বিজ্ঞপ্তি জারি করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে বন্দরে সংরক্ষিত সব ধরনের পণ্য, কার্গো ও কন্টেইনারের ক্ষয়ক্ষতির জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দায়ী থাকবে না। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘দি রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কন্টেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন ১৯৯(১৪) অনুযায়ী এ ধরনের ‘অ্যাক্ট অব গড’-জনিত ক্ষতির দায় থেকে কর্তৃপক্ষ অব্যাহতি পায়।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এ অবস্থানের পর ব্যবসায়ী মহলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, আমদানিকারকদের কাছ থেকে নিয়মিত চার্জ আদায় করা হলেও পণ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিরাপদ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা বন্দরের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
এ ঘটনায় রবিবার নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে যৌথ চিঠি দিয়েছে চারটি ব্যবসায়ী সংগঠন— চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের হেফাজতে থাকা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি যদি অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ন্যায্য প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ও ব্যবহারকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের ‘দি রেগুলেশনস ফর ওয়ার্কিং অব চট্টগ্রাম পোর্ট (কার্গো অ্যান্ড কন্টেইনার), ২০০১’-এর রেগুলেশন ১৯৯ অনুযায়ী সাত ধরনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় কর্তৃপক্ষ নেবে না। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ‘অ্যাক্ট অব গড’, ফোর্স মেজর, স্বাভাবিক ব্যবহারজনিত ক্ষয়, পণ্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যজনিত ক্ষতি এবং নির্দিষ্ট কিছু যান্ত্রিক ত্রুটিজনিত ঘটনা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি এবারই প্রথম নয়, অতীতেও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দেওয়া হয়েছে। বন্দরের বিধিমালায় এ ধরনের ঘটনায় দায়মুক্তির বিধান রয়েছে বলেই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে”।
তিনি বলেন, “কন্টেইনার না খুলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। আমদানিকারকের অনুমতি ও উপস্থিতি ছাড়া কন্টেইনার খোলার এখতিয়ার বন্দরের নেই”।