× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আজিমপুর সরকারি কলোনি

অ্যালোটিদের বাগড়া মেগা প্রকল্পে

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি জরাজীর্ণ ভবন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির একটি জরাজীর্ণ ভবন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রকল্প অনুমোদনের পর পেরিয়ে গেছে ১১ মাস। কিন্তু শুরু করা সম্ভব হয়নি রাজধানীর আজিমপুর সরকারি কলোনির (জোন–সি) ৭৭৪ কোটি টাকার পুনর্গঠন প্রকল্পের কাজ। কাগজে-কলমে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও মাঠপর্যায়ে একটি ইট পর্যন্ত টুকরো করা সম্ভব হয়নি। এখন আপিল বিভাগের আদেশে আইনি জট কেটেছে।

কিন্তু বিকল্প আবাসন পেয়েও সরকারি ফ্ল্যাট ছাড়তে অনীহা দেখাচ্ছেন বরাদ্দপ্রাপ্তদের (এলোটি) একাংশ। অভিযোগ পাওয়া গেছে, অবৈধ ‘সাবলেট’ বাণিজ্যের স্বার্থে ও কোয়ার্টার্স কল্যাণ সমিতির কয়েকজন নেতার অপতৎপরতায় ঝুঁকিপূর্ণ আবাসনকে নিরাপদ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের এই প্রকল্প আটকে আছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আজিমপুর সরকারি কলোনির (জোন–সি) এলাকায় আধুনিক ফ্ল্যাট প্রকল্প নেওয়া হয়। যার মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৯ দশমিক ২৬ একর জমিতে বিদ্যমান ৪১৮টি ফ্ল্যাটের পরিবর্তে ১১টি ২০ তলা ভবনে মোট ৮৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পে একটি মসজিদ, কমিউনিটি ভবন, জলাধার এবং প্রায় ৬০ শতাংশ উন্মুক্ত সবুজ পরিসর রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মরণফাঁদে রমরমা আবাসন বাণিজ্য

সরেজমিন দেখা গেছে, বর্তমান জোন–সি এলাকার ৩১টি ভবনের বড় অংশ নির্মিত হয়েছিল ১৯৫৪-৫৫ এবং ১৯৯৪-৯৫ সময়কালে। দীর্ঘ ব্যবহারে বহু ভবনের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তরা খসে পড়ছে, কোথাও কোথাও কাঠামোর ভেতরের রড পর্যন্ত উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই মরণফাঁদের ভেতরেই চলছে রমরমা বেসরকারি আবাসন বাণিজ্য। ভবনে বরাদ্দপ্রাপ্ত অনেক কর্মচারীই নিয়ম ভেঙে ফ্ল্যাটের রুম সাবলেট দিয়েছেন। এসব কোয়ার্টারে সাবলেট থাকা এমন ৬ জনের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাদের একজন রফিক, পেশায় কোচিং সেন্টারের পরিচালক। ৩১ নম্বর ভবনে সাবলেটে থাকা এই বেসরকারি কর্মজীবী জানান, প্রতি মাসে একটি সিটের জন্য ৪ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাকে। সাবলেটে থাকা আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাফিজা (ছদ্মনাম)। তিনি গত তিন বছর ধরে ১৯/১ নম্বর ভবনে সাবলেট ভাড়া থাকছেন। তিনি বলেন, “ভবনগুলো বেশ পুরনো। কিছুদিন ধরে শুনছি কলোনি ভেঙে নতুন প্রকল্প হবে। কিন্তু কী হবে সেটা স্পষ্ট জানি না। আমাদেরকে বাসা ছাড়ার কথা বলা হয়নি”।

অভিযোগ উঠেছে, কলোনির বাসিন্দাদের একাংশ ব্যক্তিগত সুবিধা ও সাবলেট বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে আজিমপুর গভ. কোয়ার্টার্স (দক্ষিণাঞ্চল) কল্যাণ সমিতির ব্যানার ব্যবহার করে এ প্রকল্পের বিরোধিতা করছে। সমিতির নেতারা জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে নতুন এ আবাসন নির্মাণ প্রকল্পের মূল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী এবং বরাদ্দপ্রাপ্ত বাসিন্দা দুলাল হোসেন বলেন, “আমাকে আলীগঞ্জে বাসা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে প্রতিদিন ঢাকায় এসে অফিস করা কঠিন হবে। সন্তানরাও এখানকার স্কুলে পড়ে। কাছাকাছি বিকল্প বাসা হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো”।

আইনি ঢাল ব্যবহারের চেষ্টা এলোটিদের

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা-৯ থেকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি অনুমোদিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন জোন-সি এলাকার ৩১টি ভবন পুনর্গঠনের কারিগরি ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করে। ওই প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভবন অপসারণ এবং নতুন ভবন নির্মাণ কার্যক্রমের অনুমোদন দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, অপসারণ কার্যক্রম সহজ করতে ৩১টি ভবনকে মোট ৬টি লটে ভাগ করা হয়। ওপেন টেন্ডারিং মেথডে নিলামভিত্তিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র বিক্রির শেষ তারিখ ছিল ৮ ফেব্রুয়ারি এবং জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত। নির্বাচিত ঠিকাদারকে ভবন হস্তান্তরের পর ৩০ দিনের মধ্যে কাঠামো অপসারণ ও মালামাল সরিয়ে নেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছিল। তবে দরপত্র প্রক্রিয়ার পরদিনই প্রকল্প নতুন মোড় নেয়। প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় পুরনো ভবনগুলো যাতে ভাঙা না হয়, সেজন্য হাইকোর্টে পরপর তিনটি রিট করে এলোটিরা। কলোনি পুনর্গঠনে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের বিরুদ্ধে চলতি বছরের ১০ই ফেব্রুয়ারি প্রথম রিটটি (পিটিশন নং- ১৮৪৪/২০২৬) করেন সমিতির সভাপতি কোহিনূর আক্তার। এছাড়াও কলোনির বাসিন্দা মো. জাহিদুল ইসলাম এবং মো. জালাল উদ্দিন হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন করেন।

কলোনি আঁকড়ে রাখার এই আইনি ঢাল শেষ পর্যন্ত টেকেনি। হাইকোর্ট বিভাগের এই তিনটি পৃথক স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করে সরকার পক্ষ। দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২৯ জুন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চ তিনটি লিভ টু আপিল আবেদনই (নং ১৬৬০/২০২৬, ১৬৫৮/২০২৬ ও ১৬৫৯/২০২৬) নিষ্পত্তি করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ববর্তী সব আদেশ স্থগিত করেন এবং মাঠপর্যায়ে বিদ্যমান স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) পুরোপুরি দূর করেন। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ৪১৮ পরিবারের সবার জন্যই পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার মিরপুরের পাইকপাড়ায় ১১৮ পরিবার, নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে ২২৩ পরিবার এবং আজিমপুরের অন্যান্য জোন ও মৌচাক এলাকায় ৪৪ পরিবারের জন্য বিকল্প বাসা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্প শেষে বর্তমানের বাসিন্দারা অগ্রাধিকারভিত্তিতে আজিমপুরে আধুনিক ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাবেন।

বিভিন্ন পক্ষের ভাষ্য

এ প্রসঙ্গে সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (উপসচিব) নাহিদ উল মোস্তাক বলেন, “জোন-সি এর এলোটিরা সবাই আজিমপুরেই থাকতে চান। কিন্তু আমাদের কাছে তাদের আজিমপুরে পুনর্বাসন করার মতো পর্যাপ্ত খালি বাসা নেই। আমরা মিরপুর এবং যেসব এলাকায় বাসা খালি আছে সেখানে বিকল্প বরাদ্দ দিয়েছি। নতুন বিল্ডিংগুলো তৈরি হলে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের আবার আজিমপুরেই ফিরিয়ে আনা হবে”।

অভিযোগ রয়েছে, বাসিন্দাদের একটি অংশকে বাসা না ছাড়তে উৎসাহ দিচ্ছেন সমিতির সভাপতি কোহিনূর আক্তার এবং সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন (কাউসার)। মনোয়ার হোসেন ঢাকা মশক নিবারণী দপ্তরের ক্রু হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নিয়োগ-সংক্রান্ত তথ্য গোপন ও অসদাচরণের অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ১৫ মার্চ তাকে সরকারি চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। পরের বছর ৫ জানুয়ারি তাকে আজিমপুরের বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি আজও বাসা ছাড়েননি। এসব অভিযোগের বিষয়ে মনোয়ার হোসেন বলেন, “আদালত আমাকে চাকরিতে পুনর্বহালের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই আদেশের ভিত্তিতেই আমি বর্তমানে সরকারি কোয়ার্টারে অবস্থান করছি এবং চাকরিতে যোগ দেওয়ার আবেদন করেছেন, যা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে”। তিনি আরও দাবি করেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি এখনও বাকি রয়েছে।’ তার ভাষ্য, বর্তমান বাসিন্দারা ঢাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবী। তাদের রাজধানীর বাইরে পুনর্বাসন করা সরকারি আবাসন বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

সমিতির সভাপতি কোহিনূর আক্তার বলেন, “আজিমপুরের জোন-সিÑএর বিষয়ে আমরা হাইকোর্টে রিট করেছিলাম। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশগুলো স্থগিত করেছে। তবে বিষয়টি পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি। আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের পরিকল্পনা করেছি। আমাদের বিকল্প বাসা কোথায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সে ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাইনি। আমাদের কাছে কোনো নোটিশ বা চিঠি আসেনি”।

আজিমপুর গভ. কোয়ার্টার্স (দক্ষিণাঞ্চল) কল্যাণ সমিতির সভাপতির এ বক্তব্য প্রসঙ্গে নাহিদ উল মোস্তাক বলেন, “চিঠিগুলো আমরা একসঙ্গে অর্ডার করেছি এবং সেগুলো ডাকে ও ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতেও পাঠানো হয়েছে। অফিসে আসা অনেককে হাতে হাতেও দেয়া হয়েছে”।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও দেরি হলে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে বসবাসকারী শত শত পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে, পাশাপশি প্রকল্প ব্যয়ও বাড়তে পারে। এ বিষয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট আজিমপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল হালিম বলেন, “বর্তমান ভবনগুলো কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আধুনিক ভূমিকম্প সহনশীল মানদণ্ড অনুসারে নির্মিত নয়। মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটলে এসব ভবনের বিভিন্ন অংশের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা জানমালের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আমাদের লক্ষ্য যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা। প্রকল্প সম্পন্ন হলে সরকারি সেবাগ্রহীতাদের জন্য এটি টেকসই আবাসন মডেল হয়ে উঠবে”।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা