স্পটলাইট
সৌরভ হোসেন
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পটপরিবর্তন হয়েছে, বদলেছে চাঁদা আদায়ের কৌশল আর খাতা; কিন্তু ভাগ্য বদলায়নি ঢাকার ফুটপাত ও গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষের। ঢাকার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও পরিবহন এলাকা পর্যবেক্ষণ করেছেন সৌরভ হোসেন
যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল ও পল্টন এলাকায় নতুন রূপ ধারণ করেছে চাঁদাবাজি। কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ে, কোথাও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে প্রকাশ্যেই চলছে এই অবৈধ অর্থ আদায়। ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা খোয়াচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেট ও নগর অর্থনীতিতে।
সরেজমিন রাজধানীর এই তিন এলাকা ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চাঁদাবাজির ধরন কিছুটা বদলেছে। আগে যা ছিল প্রকাশ্য ‘লাইনম্যানের চাঁদা’, তা এখন অনেক জায়গায় রূপ নিয়েছে ‘দৈনিক দোকান ভাড়া’ কিংবা ‘রাস্তা ব্যবহারের টোল’ হিসেবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহন চালকদের অভিযোগ, সুনির্দিষ্ট সময় পরপর একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভয়ভীতি দেখিয়ে এই অর্থ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া, মালামাল ও গাড়ি ভাঙচুর কিংবা এলাকাছাড়া করার মতো হুমকিও দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। ফলে ভবিষ্যতের হয়রানির আশঙ্কায় মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকেই।
পরিবহনে প্রকাশ্য নৈরাজ্য
পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি এখন সবচেয়ে নিয়মতান্ত্রিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। যাত্রাবাড়ী মোড়ে কথা হয় দূরপাল্লা ও লোকাল বাসের একাধিক চালকের সাথে। ইয়াসিন নামে এক বাস চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যাত্রাবাড়ী থেকে ছেড়ে মতিঝিল ও পল্টন হয়ে আমাদের দুই শতাধিক বাস চলাচল করে। প্রতিটা বাসকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে নিয়ম করে চাঁদা দিতে হয়। টাকা না দিলে রাস্তায় গাড়ি নামাতে দেওয়া হবে না বলে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। এই রুটে টিকে থাকতে হলে প্রতিদিনের উপার্জনের বড় একটা অংশ এদের হাতে তুলে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’
একই চিত্র দেখা গেছে মতিঝিলের লেগুনা স্ট্যান্ডগুলোতে। আরিফুর নামের এক লেগুনা চালক দৈনিক জিম্মিদশার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘এই রুটে কয়েকশ লেগুনা চলে। আমাদের প্রতিটা গাড়ি থেকে প্রতিদিন ২০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হয়। শুধু এই একটা রুট থেকেই প্রতিদিন প্রায় অর্ধলাখ টাকা তুলে নেয় চাঁদাবাজরা। এটা সম্পূর্ণ অবৈধ জেনেও পেটের দায়ে আমরা টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছি।’ পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অতিরিক্ত চাঁদাবাজির কারণেই ঢাকা শহরে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।
‘আপডেট ভাড়া’র নামে ফুটপাতে চাঁদা
সবচেয়ে অভিনব ও উদ্বেগজনক রূপ দেখা গেছে পল্টন এলাকার ফুটপাতে। সেখানে এক চা দোকানির সাথে আলাপকালে ওঠে আসে চাঁদাবাজির নতুন রূপের গল্প। তিনি জানান, প্রতিদিন দোকান বসানো বাবদ ৩০০ টাকা করে দিতে হয় স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী, বিশেষ করে যুবদলের নাম ভাঙানো কিছু নেতাকর্মীকে। ফুটপাতে বসে কেন ভাড়া দিচ্ছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বুঝেন না মামা, চাঁদা এখন আপডেট হয়ে ‘ভাড়া’য় পরিণত হয়েছে! সারাদিন রোদ-বৃষ্টিতে কষ্ট করে যা কামাই করি, তার একটা বড় অংশই ওরা এসে নিয়ে যায়। যার দোকান যত বড়, তার চাঁদার পরিমাণও তত বেশি।’
পল্টনেরই এক ভ্রাম্যমাণ দর্জির সাথে কথা বলে জানা যায়, তাকেও প্রতিদিন ২০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। তবে যুবদলের কোন নেতার কাছে এই টাকা যায়, তা জানতে চাইলে তীব্র আতঙ্ক গ্রাস করে তাকে। তিনি ভয়ে নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘নাম বললে কালকে এখানে আর বসতে পারব না, পরিবার নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে।’ কেবল ফুটপাত বা পরিবহনই নয়, আবাসন ও নির্মাণ খাতের ঠিকাদাররাও একই সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন। নতুন কোনো বহুতল ভবন বা নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলেই মালামাল আনা-নেওয়ার অজুহাতে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি। অপর এক নেতাকে ফোন করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অর্থনীতির ক্ষত ও প্রশাসনের ভূমিকা
অনেকের মতে, এই লাগামহীন চাঁদাবাজি কেবল আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এটি ঢাকার ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক নগর অর্থনীতির ওপর একটি বড় ধরনের চাবুক। এর ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন, যা দীর্ঘমেয়াদে বেকারত্ব তৈরি করে। ভুক্তভোগীরা যাতে সম্পূর্ণ নিরাপদে ও পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ করতে পারেন, তেমন একটি আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
তিন থানায় চাঁদাবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ অভিযোগ-পরবর্তী চাপের ভয়ে ভুক্তভোগীরা মুখ খুলছেন নাÑ এমনটা জানালে তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আপনারা যে অভিযোগগুলো পেয়েছেন, সেগুলো আমাদের জানান। আমরা ব্যবস্থা নিব।’
তবে ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, শুধু সাময়িক অভিযান চালিয়ে এই মচ্ছব বন্ধ করা সম্ভব নয়। একটি নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন, ব্যবসায়ী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রতিরোধই কেবল ঢাকাকে এই ক্রনিক চাঁদাবাজির অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে পারে।