সংসদের গ্যালারি থেকে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনে সরকারের ব্যয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের সর্বশেষ চিত্র এবং রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজস্ব প্রশাসন আধুনিকীকরণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে গতকাল রবিবার প্রশ্নোত্তর পর্বে একাধিক সংসদ সদস্যের পৃথক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। জামায়াতের সংসদ সদস্য মাহাবুবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও বেদি নির্মাণ, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে ব্রোঞ্জ, তামা ও মার্বেল পাথরের মূর্তি স্থাপন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সময় গণনার ডিজিটাল বোর্ড তৈরিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে মোট ৯৮২ কোটি ৯১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এ সংক্রান্ত ব্যয়ের মন্ত্রণালয় ও জেলাওয়ারি খরচের একটি বিস্তারিত বিবরণী সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ১.৮৮ লাখ কোটি টাকা
নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ গত ৩১ মে পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৮৮ হাজার ৭০১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় শ্রেণিকৃত ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদার, আন্তর্জাতিক মানসম্মত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আইএফআরএস-৯ বাস্তবায়ন, জামানত মূল্যায়ন ব্যবস্থা উন্নয়ন, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর ফাঁকি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা না চাপিয়ে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের কর ফাঁকি রোধে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। করপোরেট করদাতাদের জন্য ই-রিটার্ন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে এপিআই সংযোগের মাধ্যমে তথ্য বিনিময়, ঝুঁকি-ভিত্তিক নিরীক্ষা, অনলাইনে উৎসে কর কর্তন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ইচ্ছাকৃত কর ফাঁকিদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হলেও তা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ১০ শতাংশে বহাল রাখা হয়েছে এবং উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।
তিনি জানান, এ তহবিলের ৪১ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব উৎস থেকে সরবরাহ করবে।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে লুটপাটের তদন্ত চলছে
আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষা করাই বর্তমান সরকারের ‘টপ প্রায়োরিটি’ বা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, পুরো ফাইন্যান্সিয়াল সেক্টরে এখন একটি ‘ক্লিনিং প্রসেস’ বা পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। ব্যাংক ও আর্থিক খাতে গত কয়েক বছরে সংঘটিত সব অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের তদন্ত হচ্ছে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে অব্যাহত রয়েছে।
সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনিয়ম ও ঋণখেলাপি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গাজীপুর-৪ আসনের সংসদ সালাউদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেন, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তদবির, ঘুষ-বাণিজ্য এবং সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোনের নামে লুটপাট করা হয়েছে, যার কারণে ব্যাংকটির প্রায় ৬১ শতাংশ ঋণই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
সালাউদ্দিনের এই প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানো এই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আর্থিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে যেতে হলে এটি নিশ্চিত করতেই হবে। কেবল একটি ব্যাংক নয়, অনেকগুলো ব্যাংকে কী ঘটেছে তা নিয়ে তদন্ত হচ্ছে।
এরপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য ফারহানা সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর এলাকার কৃষিপণ্য সংরক্ষণাগার (হিমাগার) ও কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিকল্পনার বিষয়ে জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য চলমান তহবিলের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পাচ্ছেন, যেখানে গ্রামীণ এলাকা অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এ ছাড়া কৃষি ও পল্লী খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম গঠন করা হয়েছে এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণের জন্য ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আমদানি বিকল্প ফসল চাষে ৪ শতাংশ রেয়াতি সুদে ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এই বক্তব্যের পর একটি সম্পূরক প্রশ্ন নিয়ে আসেন সংসদ সদস্য ফারহানা। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকে গত ১৫ বছরে যে পরিমাণ ঋণ দেওয়া হয়েছে, তার প্রায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশই খেলাপি। বিশেষ করে জনতা ব্যাংকের ৭০ শতাংশ খেলাপি ঋণই এসআরএম, বেক্সিমকো, অ্যালন টেক্স গ্রুপ ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হয়েছে। যারা এই বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাট করে পরিশোধ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা জানতে চান তিনি।
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রশ্নটি মূল বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হলেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা দেশের টাকা লুটপাট করে বিদেশে গেছেন, তাদের ব্যাপারে এই সরকার কোনো কম্প্রোমাইজ বা আপস করবে না। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং সম্পত্তি ক্রোকের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
এরপর কুড়িগ্রাম-২ আসনের সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ তার অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের দুর্বলতা ও অনিয়মের প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন।
আতিকুর রহমান মুজাহিদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগের পরিবর্তে বিএনপির ব্যাংক দখল প্রক্রিয়া বা প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যাংকেই এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো নিয়োগ বা পলিটিক্যাল অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হচ্ছে না।
এরপর চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলার যুব সমাজের কর্মসংস্থান ও তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলায় তথ্যপ্রযুক্তির শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি উপজেলা সেবা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।