× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কর দিচ্ছে না সরকারি সংস্থাই

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) আদায়ে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে করদাতাদের অনীহা। শুধু ব্যক্তি পর্যায়েই নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর বড় একটি অংশও নিয়মিত কর পরিশোধ করছে না।

বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও বহু সরকারি সংস্থা বছরের পর বছর কর বকেয়া রেখে দিয়েছে। ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৯৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থা পর্যায়েই বকেয়া রয়েছে ৫৫৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ঢাকা জেলা প্রশাসনের হিসাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া রয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে বকেয়া আদায়ে বড় ভূমি মালিকদের বিরুদ্ধে লাল নোটিশ জারি, প্রয়োজনে সার্টিফিকেট মামলা, গ্রামাঞ্চলে বিশেষ ক্যাম্প, হাটবাজারে ভ্রাম্যমাণ অফিস পরিচালনাসহ একগুচ্ছ পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দীন, সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরা উপস্থিত ছিলেন।

কর আদায়ে বড় ঘাটতি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ মোট দাবি ৭ হাজার ৮৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৯৬৭ টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৯১৪ কোটি ৩২ লাখ ৬২ হাজার ৭৭৫ টাকা। যা মোট দাবির তুলনায় খুবই কম। ফলে বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৩৯ কোটি ৫ লাখ ২ হাজার ১৯২ টাকা। এর মধ্যে সাধারণ করদাতাদের কাছে বকেয়া রয়েছে ৬ হাজার ৩৮২ কোটি ৩১ লাখ টাকা, আর বিভিন্ন সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে বকেয়া ৫৫৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

ব্যক্তি পর্যায়ে কর আদায়ে নানা ধরনের সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হলেও সরকারি সংস্থাগুলোর একটি অংশ এখনও বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের পর নামজারি করা হয়নি। কোথাও বাজেট বরাদ্দ না থাকার অজুহাত দেওয়া হচ্ছে। এভাবে বছরের পর বছর কর জমতে জমতে বিশাল অঙ্কের বকেয়া তৈরি হয়েছে।

ঢাকাসহ নয় জেলায় আদায় সবচেয়ে কম

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা।

কর আদায়ের হার কম এমন জেলার তালিকায় রয়েছে ঢাকা, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও যশোর। বিশেষ করে ঢাকা ও গাজীপুরে বিপুল সংখ্যক শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা এবং নগরায়ণের বিস্তার থাকলেও প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। অন্যদিকে বিভাগভিত্তিক হিসাবেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণ পর্যায়ের ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের মধ্যে ঢাকা বিভাগে আদায় হয়েছে মাত্র ১১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১০ শতাংশ, খুলনায় ৬ শতাংশ, রংপুরে ৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ১২ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৩ শতাংশ, সিলেটে ৯ শতাংশ এবং বরিশালে ১৭ শতাংশ।

মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন নগর এলাকায় মালিকানা জটিলতা, নামজারি না হওয়া, মামলা এবং দীর্ঘদিনের রেকর্ড সমস্যার কারণে কর আদায়ে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে কয়েকটি জেলা ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বরগুনা, পঞ্চগড়, মাগুরা, ঝালকাঠি, গোপালগঞ্জ, ভোলা, মুন্সীগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, মাদারীপুর ও মেহেরপুর জেলায় তুলনামূলক বেশি কর আদায় হয়েছে। এসব জেলার প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিয়মিত ক্যাম্প, গণসচেতনতা কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে করদাতাদের উৎসাহিত করেছেন। যার প্রভাব পড়েছে বকেয়া আদায়ে।

লাল নোটিশ ও মামলার প্রস্তুতি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন কর আদায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু উদ্বুদ্ধকরণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে প্রতিটি মৌজায় বড় ও প্রভাবশালী ভূমি মালিকদের চিহ্নিত করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। সরকার মনে করছে, তাদের কাছ থেকে কর আদায় করা গেলে সাধারণ করদাতাদের মধ্যেও ইতিবাচক বার্তা যাবে। 

সভার আলোচনায় বকেয়া করদাতাদের বিরুদ্ধে লাল নোটিশ জারি এবং প্রয়োজনে সার্টিফিকেট মামলা দায়েরের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া কর বকেয়া থাকলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর, বন্ধক রাখা কিংবা ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধিনিষেধ কঠোরভাবে প্রয়োগের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। নামজারি সম্পন্ন করার আগেই ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ নিশ্চিত করার নির্দেশনাও দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও কর দিতে হবে

সভায় ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু কর পরিশোধের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “অতীতে শক্তি প্রয়োগ করে কর আদায় করা হতো। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশ নেয়। ব্যক্তি হোক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানÑ সবারই নিয়মিত কর পরিশোধ করা উচিত। কারণ উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন”।

সভায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদ কর আদায়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “ভূমি উন্নয়ন কর রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক-উভয় পর্যায়ে বকেয়া কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অনলাইন ব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগিয়ে দ্রুত হোল্ডিং যাচাই, নামজারি সম্পন্ন এবং করদাতাদের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। কর আদায়কে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, সুশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে দেখতে হবে।”

অনলাইন ব্যবস্থাও পুরোপুরি কার্যকর নয়

ভূমি উন্নয়ন কর আদায় পুরোপুরি অনলাইনে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল। সে সময় নির্দেশনা ছিল, অনলাইনে আবেদন করার সাত কার্যদিবসের মধ্যে হোল্ডিং যাচাই ও অনুমোদন করতে হবে এবং দেশের সব হোল্ডিংকে অনলাইন দাবির আওতায় আনতে হবে। তবে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনও বহু এলাকায় পুরনো রেকর্ড, মালিকানা জটিলতা, তথ্য হালনাগাদের ধীরগতি এবং জনবল সংকটের কারণে সব হোল্ডিং অনলাইন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, “অনলাইন ব্যবস্থার কারণে স্বচ্ছতা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে রেকর্ডের অসঙ্গতি, উত্তরাধিকার সংক্রান্ত জটিলতা এবং পুরনো খতিয়ানের কারণে কাজের চাপও বেড়েছে।”

পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করার ভাবনা

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত ও বড় করদাতাদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি কিংবা পুরস্কার দেওয়ার একটি প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। তাদের মতে, শুধু মামলা বা নোটিশ দিয়ে নয়, করদাতাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেও রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, কর আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদাহরণ তৈরি করা। কারণ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোই যদি বছরের পর বছর কর বকেয়া রাখে, তাহলে সাধারণ করদাতাদের কর পরিশোধে উৎসাহিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে এবার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি সংস্থাগুলোকেও জবাবদিহির আওতায় এনে বকেয়া আদায়ের উদ্যোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে ভূমি মন্ত্রণালয়।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা