দেশের প্রধান শহরগুলোতে পরিবেশ দূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকার সকাল শুরু হয় ধুলার ধোঁয়াশায়। ব্যস্ত সড়কে বের হলেই শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতিকর সূক্ষ্ম ধুলিকণা।
শিল্পবর্জ্যে কালো হয়ে গেছে নদ-নদী, নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার থামেনি, শব্দ দূষণ ও নির্মাণ কাজের ধুলা নিত্যসঙ্গী।
দেশের প্রধান শহরগুলোতে পরিবেশ দূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি।
অথচ এই বাস্তবতার সঙ্গে পরিবেশ আদালতের মামলার চিত্রের রয়েছে বিস্ময়কর বৈপরীত্য।
দেশে বর্তমানে কার্যকর তিনটি পরিবেশ আদালতে পরিবেশসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা অত্যন্ত কম। অধিকাংশ সময় এসব আদালতে পরিবেশ মামলার পরিবর্তে সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচারই বেশি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর অতিনির্ভরশীলতা, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতকেন্দ্রিক আইন প্রয়োগের কারণে পরিবেশ আদালত প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
পরিবেশ নিয়ে কাজ করা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়নেও বাংলাদেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
পরিবেশসংক্রান্ত ১১টি সূচকের ভিত্তিতে দেশের প্রধান শহরগুলোকে উচ্চমাত্রার দূষণপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স (ইপিআই)-২০২৪ অনুযায়ী, পরিবেশ সুরক্ষায় ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম।
পরিবেশবিদদের মতে, বায়ুদূষণ, নদী দূষণ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য, ইটভাটার ধোঁয়া, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, প্লাস্টিক দূষণ ও যানবাহনের কালো ধোঁয়াÑ সব মিলিয়ে দেশের পরিবেশগত সংকট এখন বহুমাত্রিক।
এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতিতে। তাদের প্রশ্ন, প্রতিদিন পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও আদালতে মামলার সংখ্যা এত কম কেন?
ঢাকার পরিবেশ আদালতের পরিসংখ্যানই এ বাস্তবতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
আদালত সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিচারাধীন মোট ৮ হাজার ৩২২টি মামলার মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী দায়ের হওয়া মামলা মাত্র ১৮২টি। অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ মামলাই পরিবেশ বহির্ভূত। ২০২৪ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে আদালতে পাঠানো হয়েছে মাত্র দুটি মামলা, আর ২০২৫ সালে হয়েছে তিনটি। প্রায় ২৩ বছরে আদালতটিতে মোট ৬০৮টি পরিবেশ মামলা দায়ের হয়েছে, যার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৪৯১টি।
চট্টগ্রামের তৃতীয় পরিবেশ আদালতের অবস্থাও একই রকম।
গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সেখানে বিচারাধীন পরিবেশ মামলার সংখ্যা ছিল ৪৪টি।
এর মধ্যে ২৮টি মামলা পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ আদালতে মামলা কম হওয়ার অন্যতম কারণ পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এর সীমাবদ্ধতা। বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি পরিবেশ আদালতে মামলা করতে পারে না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হয়। অধিদপ্তরের তদন্ত ও প্রতিবেদন পাওয়ার পরই মামলা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচারের পথেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
আরেকটি বড় কারণ হিসেবে ওঠে এসেছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
পরিবেশ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে তাৎক্ষণিক জরিমানা করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা আদালতে পাঠানো হয় না।
ফলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং ভবিষ্যতে একই অপরাধ প্রতিরোধের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
ঢাকার পরিবেশ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মাসুদুর রহমান বাদল বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমেই আদালতে মামলা আসে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি মামলা করতে পারলে মামলার সংখ্যা বাড়তে পারত, কিন্তু বর্তমান আইনে সে সুযোগ নেই।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, পরিবেশ মামলার স্বল্পতার কারণে পরিবেশ আদালতেও অন্যান্য দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করতে হচ্ছে।
তার মতে, পরিবেশ অধিদপ্তর আদালতে মামলা করার চেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অর্থদণ্ড আরোপকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের সরাসরি মামলা করার সুযোগ না থাকায় বহু ঘটনা আদালত পর্যন্ত পৌঁছায় না।
পরিবেশবাদীদের মতে, নদী দখল, নদী দূষণ, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট, অবৈধ ইটভাটা, প্লাস্টিক দূষণ, শিল্পবর্জ্য ফেলা ও শব্দ দূষণের মতো অসংখ্য অপরাধ প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) মো. খালেদ হাসান বলেন, পরিবেশ আদালতে মামলার সংখ্যা কম হলেও অধিদপ্তরের নিজস্ব মামলার সংখ্যা অনেক। এছাড়া বিভিন্ন বিশেষ আদালতেও পরিবেশসংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়।
তিনি জানান, ভুক্তভোগীদের সরাসরি মামলা করার সুযোগ রেখে আইন সংশোধনের একটি প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারবেন অথবা ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী থানায় এজাহার দাখিলের সুযোগ পাবেন।
পরিবেশ আইন নিয়ে কাজ করা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ আদালতকে কার্যকর করতে হলে নাগরিক ও নিবন্ধিত পরিবেশবাদী সংগঠনের সরাসরি মামলা করার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আদালতের বিচারিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, বিশেষায়িত প্রসিকিউশন ব্যবস্থা, শক্তিশালী তদন্ত এবং দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে।
দূষণ বাড়ছে, বিচার কি এগোবে
বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণ এখন শুধু প্রকৃতির সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ।
দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হৃদ্রোগ, ক্যানসারসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য, সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট।
এমন বাস্তবতায় পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
যখন আদালতে পরিবেশ মামলার সংখ্যা হাতে গোনা, তখন দূষণকারীদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত হচ্ছে- সেই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতের তাৎক্ষণিক জরিমানা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। প্রয়োজন শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং নাগরিকের জন্য সহজ বিচারপ্রাপ্তির পথ।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পরিবেশ দূষণ এখন শুধু প্রকৃতির সংকট নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। তাই শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতের তাৎক্ষণিক জরিমানায় নয়, শক্তিশালী ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থার মাধ্যমেই পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর পরিবর্তন আনা সম্ভব। অন্যথায় দূষণের বিস্তারের পাশাপাশি পরিবেশবিষয়ক ন্যায়বিচারও অধরাই থেকে যাবে।