বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রামের ঘর-বাড়ি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, সিলেট ও পার্বত্য জেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে। এই বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক ও মৎস্য খামারিরা। ব্ন্যায় তাদের আউশ ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভেসে গেছে মাছের খামারও। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বসতবাড়ি, সড়ক ও বাঁধ। চট্টগ্রাম ও সিলেট রেঞ্জের ৭০টি থানা এলাকার বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের কাছে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এতে ৫ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত সময়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি হয়েছে ৪৪ জনের। আহত হয়েছে ৩৩ জন ও নিখোঁজ আছে ৪ জন। এ প্রতিবেদন অনুযায়ী বন্যাপরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আগাম পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে বলে সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা বৃষ্টিতে ১৯ জেলায় বন্যা ছড়িয়ে পড়লেও সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৯টি জেলার ৭০টি থানা এলাকার বাসিন্দারা। জেলাগুলো হচ্ছেÑ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ১৮, কক্সবাজারের ১০, রাঙামাটির ৯, খাগড়াছড়ির ৯, বান্দরবানের ৭, মৌলভীবাজারের ৭, হবিগঞ্জের ৯ ও সুনামগঞ্জের একটি থানা এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি অনেক এলাকার বাঁধও ভেঙে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৭৮ হেক্টর কৃষিজমি।
টানা আট দিনের বন্যায় কয়ারবিল ও লেমশীখালী সংযোগ সেতু ধসে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়কের বেশ কিছু স্থান। প্রাথমিকভাবে কৃষি খাতে আর্থিক ক্ষতি ২৪৫ কোটি টাকা বলে ধারণা করা হলেও বন্যাপরবর্তীতে রাস্তাঘাট, বসতভিটাসহ অন্য খাতে তা হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এসব এলাকায় দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োজিত রয়েছেন সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা। তারা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ-তৎপরতায় নিয়োজিত রয়েছেন। বন্যাপরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ওইসব এলাকায় পুনর্বাসনে সরকারকে আরও তৎপর হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে। সে অনুযায়ী, আগাম পরিকল্পনার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক বন্যা পরিস্থিতি মনিটরিং করে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারের উখিয়ায় ১৪ জন। এ ছাড়া বাঁশখালীতে ৩ জন, সীতাকুণ্ডে ১ জন, রাঙ্গুনিয়ায় ১ জন, দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় ১ জন, আনোয়ারায় ২ জন, সাতকানিয়ায় ২ জন, কক্সবাজার সদরে ২ জন, চকরিয়ায় ৪ জন, মাতামুহুরীতে ১ জন, পেকুয়া এবং মহেশখালীতে ২ জন, রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি এবং বিলাইছড়িতে ৩ জন, খাগড়াছড়ির নাইক্ষ্যংছড়িতে ১ জন, বান্দরবানের লামায় ৫ জন এবং সিলেটের রাজনগরে ২ জন নিহত হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ১৭৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালীতে। এরপর সাতকানিয়ায় ৫২ কোটি, মীরসরাইয়ে অর্ধকোটি, সীতাকুণ্ডে অর্ধকোটি, হাটহাজারীতে ৮ কোটি, রাঙ্গুনিয়ায় ৫ কোটি এবং পটিয়ায় ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় সর্বমোট ১ হাজার ৬৭৮ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় শুধু কৃষিজমিই নয়, যোগাযোগব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, এখন পর্যন্ত বন্যায় ৪৪ জনের প্রাণহানি ও ৩৩ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া নিখোঁজ ৪ জনকে উদ্ধারে তৎপরতা চলমান রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়ও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের অপরাধ, বিশৃঙ্খলা বা সুযোগসন্ধানী কর্মকাণ্ড না ঘটে, সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সতর্ক থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।