গুলশান বা বিমানবন্দর এলাকাই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, সড়ক, নৌ ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে ভাসমান ও স্থায়ী ভিক্ষুকদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
গত ৭ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর বিমানবন্দরের সামনের সড়কে ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক বিদেশি নাগরিক। এ সময় তিনজন মধ্যবয়সী নারী তাকে ঘিরে ধরেন। দীর্ঘ সময় তাদের অনুরোধের মুখে একপর্যায়ে ওই বিদেশি নাগরিক এক হাজার টাকার একটি নোট দিয়ে পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হন। এর আগে, ৫ জুলাই সকাল ১০টার দিকে গুলশান-২-এর শাহাবুদ্দিন পার্কের সামনে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। নিয়মিত শরীরচর্চার জন্য আসা বিদেশি নাগরিকরা পার্ক থেকে বের হওয়ার সময় ৩-৪ জন ভিক্ষুক তাদের ঘিরে ধরে অর্থ দাবি করেন। অনেকে নাছোড়বান্দা হয়ে পড়ায় বিদেশি নাগরিকরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন।
শুধু গুলশান বা বিমানবন্দর এলাকাই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকা, ট্রাফিক সিগন্যাল, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা, সড়ক, নৌ ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে ভাসমান ও স্থায়ী ভিক্ষুকদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে পথচারীদের ঘিরে ধরে বারবার অর্থ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত অস্বস্তিকর ও বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। এ ধরনের আগ্রাসী ভিক্ষাবৃত্তি বিদেশি নাগরিকদের কাছেও দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। অথচ ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন ও পুনর্বাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের দাবি উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে ভিক্ষুকের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সরকারি সংস্থার কাছে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এ বিষয়ে কোনো জাতীয় জরিপ পরিচালনা করেনি। ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচির পরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, “সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপ পরিচালনার এখতিয়ার নেই। ফলে অধিদপ্তরের কাছেও ভিক্ষুকের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা ৭ থেকে ১০ লাখ হতে পারে”।
অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, এ বিষয়ে কখনও জাতীয় জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ সম্ভব হচ্ছে না এবং নীতিনির্ধারণ ও বাজেট প্রণয়নেও এর প্রভাব পড়ছে।
সরকারি ও বেসরকারি হিসাবের বড় ব্যবধান
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে তালিকাভুক্ত ভিক্ষুকের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার। অন্যদিকে, বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ধারণা অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে প্রকৃত ভিক্ষুকের সংখ্যা ২০ থেকে ৩০ লাখেরও বেশি হতে পারে।
মো. শাহজাহান বলেন, “২০১৭ সালে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আড়াই লাখ ভিক্ষুকের তালিকা অধিদপ্তরে জমা পড়ে। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েকগুণ বেশি হতে পারে”।
লোকবল ও আইনি সীমাবদ্ধতা
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অধিদপ্তর নিজ উদ্যোগে এ ধরনের জরিপ পরিচালনা করতে পারে না। এ ছাড়া পুনর্বাসন প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা কম হওয়ার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং জনবল সংকট।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) সাইফুল ইসলাম বলেন, “অধিদপ্তরে প্রায় সাড়ে তিন হাজার পদ শূন্য রয়েছে। নতুন পদ সৃষ্টি না হলেও শূন্য পদের বিপরীতে সম্প্রতি ১ হাজার ৪৮৫ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে”।
শিগগিরই নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হবে বলে তিনি জানান।
বিবিএসের অবস্থান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দপ্তর জানায়, ঢাকা বা সারা দেশের ভিক্ষুক নিয়ে তারা কখনও কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি। সংস্থাটির গ্রন্থাগারেও এ-সংক্রান্ত কোনো প্রকাশনা বা পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
জেলা পর্যায়ের চিত্র
সাতক্ষীরা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, “পুনর্বাসনে বরাদ্দ কম থাকায় ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে না। তার ভাষ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলার জন্য তিন দফায় মোট তিন লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে, যা সাতটি উপজেলায় বণ্টন করা হয়েছে”।
শরীয়তপুর, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলার প্রতিবেদকরা জানিয়েছেন, শহরাঞ্চলে ভিক্ষুকের সংখ্যা কমেনি; বরং ভাসমান ভিক্ষুকের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে জেলা পর্যায়ে দৃশ্যমান পুনর্বাসন কার্যক্রম খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা লায়লা আক্তারের কাছে পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো তথ্য দেননি।
শুক্রবারে বাড়ে উপস্থিতি
ভিক্ষুক নিয়ে কাজ করা কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার দাবি, শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক ভিক্ষুক জড়ো হন। রেলওয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন, বৃহস্পতিবার বিপুলসংখ্যক ভিক্ষুক ট্রেনে করে ঢাকায় আসেন।
অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে কিছু ব্যক্তি অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, মাদক পরিবহন বা কেনাবেচাসহ বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
পুনর্বাসন কর্মসূচির বরাদ্দ
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, ‘ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় ২০১০-১১ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত মোট প্রায় ৭৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১২ কোটি টাকা মাঠপর্যায়ে ব্যয় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, সারা দেশের প্রেক্ষাপটে এ বরাদ্দ অপর্যাপ্ত।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, “আপাতত ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণ ও পুনর্বাসনে নতুন কোনো পরিকল্পনা নেই। বর্তমান বাজেট ও কর্মসূচি আগের ধারাবাহিকতায় চলবে। প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়টি মন্ত্রণালয় বিবেচনা করবে”।