সরকার সংবিধানের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাইলেও সংসদীয় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জোটের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ‘সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি’ গঠন করা যাচ্ছে না। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর চারটি বিধান বাতিলে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার ফলে ফিরে এসেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা।
তবে সংবিধান নিয়ে ত্রিশঙ্কু অবস্থায় পড়েছে জাতীয় সংসদ, যার পেছনে রয়েছেÑ গণভোটের আলোকে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদে’র সদস্য হিসেবে বিএনপির শপথ না নেওয়া, নির্বাচনি ইশতেহারে সরকারি দলের প্রতিশ্রুত ৩৫টি সাংবিধানিক সংস্কারের প্রক্রিয়া এবং উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক রায় বাস্তবায়ন।
সরকার সংবিধানের বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চাইলেও সংসদীয় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জোটের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে ‘সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি’ গঠন করা যাচ্ছে না।
বিদ্যমান পরিস্থিতি প্রলম্বিত হলে সরকারকে বিরোধী দল ছাড়াই বিশেষ কমিটি গঠনের দিকে হাঁটতে হতে পারে।
এ সম্পর্কে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আমরা প্রথম অধিবেশন থেকেই সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এখনও নাম পাওয়া যায়নি। আমরা আশাবাদী, তারা নাম দেবেন। আমরা তাদের জন্য অপেক্ষা করছি।”
তিনি বলেন, “উচ্চ আদালতের রায়ের পরে সংবিধান সংশোধনের পুরো দায়িত্ব সংসদের ওপরে পড়েছে। আশা করছি, বিরোধী দল বিষয়টি বুঝতে পারবেন এবং তাদের সদস্যদের নাম দেবেন।”
গত ৯ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয় পরিবর্তন করে আনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগের এ রায়ের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রয়েছে।
পঞ্চদশ সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করা রিটে হাইকোর্ট চারটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছিলেন।
এর আগে ২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপসহ বেশকিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
সংশোধনীতে সংবিধানে পরিবর্তন আসে ৫৪টি ক্ষেত্রে। এগুলোর মধ্যে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান, জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বীকৃতির পাশাপাশি সংবিধানে জাতীয় চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনা অন্যতম।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরো আইন ও আইনের কয়েকটি ধারার বৈধতা নিয়ে ২০২৪ সালে হাইকোর্টে আলাদা দুটি রিট হয়।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেন।
রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাদ দেওয়া-সংক্রান্ত সেই সংবিধান আইনের ২০ ও ২১ ধারা বাতিল ঘোষণা করা হয়।
ওই দুটিসহ পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭(ক), ৭(খ), ৪৪(২) অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিলও ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছরের ৮ জুলাই প্রকাশিত হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে চার বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং অন্যরা পৃথক লিভ টু আপিল করেন।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৪(২) অনুযায়ী নিম্ন আদালতকে রিটের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
হাইকোর্ট বিভাগ এই রিটের ক্ষমতা প্রদানকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করেন।
রায়ে বলা হয়, হাইকোর্ট বিভাগ ছাড়া আর কোনো আদালতে রিট আবেদন করার কোনো এখতিয়ার থাকবে না। এ ছাড়া যেগুলো রাষ্ট্রের পলিসি, রাষ্ট্রের নীতি, যেমনÑ সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৯, ১১, ১২ ও ২৫-এর বিষয়গুলো সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পরিপূর্ণভাবে সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। উচ্চ আদালতের এই রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সংসদের।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল রায়ের পর বলেছেন, “হাইকোর্টের রায়ে কিছু বিষয় সংসদের বিবেচনার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। সংবিধানের যেসব ক্ষেত্রে আরও পরিবর্তন বা পরিমার্জনের প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদ বিতর্ক
চলতি বছর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হয়। গণভোটের রায় অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বৈত ভূমিকা পালনের কথা ছিল।
এজন্য নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংসদ সদস্য ও ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য’ হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল।
জামায়াত ও এনসিপি জোটের সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ বলে কিছু না থাকার যুক্তি দেখিয়ে সেই শপথ নেননি।
সংসদ গঠিত হওয়ার পর গণভোট সম্পর্কিত অধ্যাদেশও বাতিল করে দেয় সরকার। আর এখানেই শুরু হয় জটিলতা।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, “তারা সংবিধান সংশোধনের পক্ষে নন।”
তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “সংবিধান সংশোধন করা হলে তাতে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তাতে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে। যে প্রক্রিয়ায় একটি মামলার রায়ের রেফারেন্সে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা হাওয়া হয়ে গিয়েছিলÑ এমন কোনো প্রক্রিয়ায় আমরা যেতে পারি না। সংবিধান সংস্কার করা হলে তার ওপর আদালতের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। বরং আদালত এই সংবিধানের রক্ষক হবে।”
সরকারি দলের সঙ্গে মতপার্থক্যের এই পরিণতি কী হবে, তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা জনগণের কাছে যাব। পার্লামেন্টে কিছু করতে না পারলে আমরা জনগণের পার্লামেন্টে যাব।”
সংবিধান সংশোধনের বিকল্প নেই
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “আমাদের সামনে এখন একটিই পথ আর সেটি হচ্ছে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন। পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল হওয়ার পর সংবিধানের মৌলিক অনেক বিষয় সংশোধনের দায়িত্ব এখন সংসদের ওপর। বিরোধী দলের সংস্কার পরিষদ ও সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘সংস্কার কিংবা সংশোধনÑ যেটাই করি না কেন আমাদের পথ একটাই।”
সংসদের চলতি অধিবেশনেই এ সম্পর্কিত কমিটি গঠিত হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমরা চেষ্টা করব। আমরা বিশ্বাস করি, বিরোধী দল সহযোগিতা করবে।”
কী হবে শেষ পর্যন্ত
সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সংবিধান সংশোধন কিংবা সংস্কারের বিষয়টিতে দেরি হচ্ছে।
নির্বাচিত সরকারের প্রায় পাঁচ মাস সময়েও সাংবিধানিক ইস্যুতে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে না পারাকে একধরনের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিরোধীদলীয় জোট শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থানে অনড় থাকলে পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে সে সম্পর্কে এখনই কোনো কৌশল নিতে চায় না সরকারি দল।
এ প্রসঙ্গে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, “জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার একক দায়িত্ব শুরু আমাদের নয়, বিরোধী দলেরও রয়েছে।”