দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও এক নতুন বিপদের সম্মুখীন হন নারী ও শিশুরা। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো প্রতিনিয়ত বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয়।
দুর্যোগের এই ভয়াবহতার মধ্যে প্রাণ বাঁচাতে স্থানীয় মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েও এক নতুন বিপদের সম্মুখীন হন নারী ও শিশুরা।
পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশের পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা) মোহাম্মদ শাহজাহানের এক গবেষণায় দুর্যোগকালীন নারী ও শিশু নিপীড়নের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি রিসার্চে ২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে ভারী বর্ষণে বন্যা ও পাহাড়ধসের চলতি বিপর্যয়ে মানুষ আবার আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হওয়ার কারণে। নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশ অবশ্য আশ্রয়শিবিরগুলোয় বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াল চিত্র
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৩৮৫ জন বাসিন্দার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পরিচালিত মিশ্র পদ্ধতির গবেষণাটিতে দুর্যোগ ও অপরাধের মধ্যকার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্যমতে, দুর্যোগকালে অপরাধের সবচেয়ে বড় শিকার হন নারীরা। মোট ভুক্তভোগীর ৫১ দশমিক ২৩ শতাংশ নারী, ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ শিশু এবং ১৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবীণ নাগরিক। সে তুলনায় পুরুষ ভুক্তভোগীর হার মাত্র ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ। দুর্যোগ চলাকালীন সংঘটিত অপরাধের চিত্রে দেখা যায়, ৫৯ দশমিক ২০ শতাংশ অপরাধই নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত।
এ ছাড়া দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ৪২ দশমিক ৫২ শতাংশ ক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে বলে গবেষণায় চিহ্নিত করা হয়েছে।
অন্যান্য অপরাধ ও চুরি
দুর্যোগের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় কিছু মানুষ নানা অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্যোগ চলাকালীন ৯৮ দশমিক ৩২ শতাংশ ক্ষেত্রে চুরির ঘটনা (পারিবারিক জিনিসপত্র, মাছ, গাছ ইত্যাদি) ঘটে এবং ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবেশীর সম্পদ দখলের ঘটনা ঘটে। দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে ৯৮ দশমিক ২৪ শতাংশ ক্ষেত্রে ত্রাণের নামে প্রতারণা ও অব্যবস্থাপনা এবং ৮৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে চুরি ও ঝগড়াঝাঁটির সৃষ্টি হয়। এই অপরাধগুলোর বড় অংশই করে থাকে স্থানীয় অধিবাসীরা (৮৬.০৩%)।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা
বিপন্ন মানুষের সুরক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
উত্তরদাতাদের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ জানিয়েছেন যে পুলিশ দুর্যোগের স্থানে উপস্থিত হয়নি এবং ৫৮ দশমিক ০৩ শতাংশ মানুষ পুলিশের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পাননি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৫৩ দশমিক ২৪ শতাংশ অভিযোগ করেছেন যে সেবা দেওয়ার নামে তাদের কাছে ঘুষ দাবি করা হয়েছে এবং ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ স্থানীয় পুলিশের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হয়েছেন।
তবে এর বিপরীতে, ৬৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ মানুষ গ্রাম পুলিশের সেবা পেয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট অভাব ও বেঁচে থাকার তাগিদ অনেক সময় মানুষকে আইন ভাঙতে বাধ্য করে। তবে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ ঠেকাতে এবং সামাজিক শান্তি বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।
জাপানের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশের উদাহরণ টেনে গবেষণায় বলা হয়েছে, সে দেশে দুর্যোগের সময় মানব আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের একটি সুনির্দিষ্ট মডেল রয়েছে, যা অনেক দেশ অনুসরণ করে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও দুর্যোগ পরিস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এমন মডেল গ্রহণ এবং নারী ও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
যা বললেন গবেষক শাহজাহান
পুলিশ স্টাফ কলেজের পরিচালক (গবেষণা ও প্রকাশনা) মোহাম্মদ শাহজাহান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “দুর্যোগের সময় মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যায়। কিন্তু সেখানে যদি নারী ও শিশু নিরাপদ না থাকে, তাহলে পুরো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। একই কক্ষে নারী, শিশু ও পুরুষের অবস্থান এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব থেকেই বেশিরভাগ যৌন হয়রানি ও কটূক্তির ঘটনা ঘটে।”
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন এই গবেষক। যেখানে তা সম্ভব নয়, সেখানে অন্তত পৃথক ফ্লোর বা নির্দিষ্ট নিরাপদ অংশ রাখতে হবে। পাশাপাশি নারী-পুলিশ, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা এবং জরুরি সহায়তা সেবা চালু করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত সহায়তা পাবেন ও অপরাধ সংঘটনের ঝুঁকিও কমবে।
বিশেষজ্ঞ অভিমত
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বিভিন্ন দুর্যোগের সময়ে সাময়িকভাবে যেসব আশ্রয়কেন্দ্র বেছে নেওয়া হয় সেগেুলো জেন্ডারগতভাবে কতটা নিরাপদÑ এ প্রশ্ন শুরু থেকেই ছিল। এখনও আছে। ভুক্তভোগীদের জায়গা দেওয়ার ক্ষেত্রে জেন্ডারগত বিষয়টি বিবেচনা করা হয় না, বিধায় এ সুযোগ কাজে লাগায় অপরাধীরা। পুরো আশ্রয়কেন্দ্রে মনিটরিং কিংবা স্বচ্ছ মানুষের সম্পৃক্ততা না থাকার কারণে বারবার অভিযোগগুলো ওঠে।”
তিনি বলেন, সরকারের উচিত স্বেচ্ছাসেবকদের আরও বেশি প্রশিক্ষণ দেওয়া। আশ্রয়কেন্দ্রে জেন্ডারগত নিরাপত্তা নিশ্চিতের পরিবেশ সৃষ্টিও সরকারের দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, “তদারকিতে যারা থাকেন তারাও যেন নিপীড়নের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক থাকেন। কারণ আশ্রয়প্রার্থীরা অনেক সময় নিপীড়নের বিষয়ে মুখ খোলেন না। স্বেচ্ছাসেবীদেরও উচিত এ ধরনের অভিযোগ উঠলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তা জানানো। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচিত এসব বিষয় সার্বিকভাবে মনিটর করা। না হলে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে নির্যাতনের খড়গ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুলিশের গবেষণাটি আমলে নিয়ে নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র থাকা জেলাগুলোর এসপিদের বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।