যুগ্মসচিব পদোন্নতি
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশ সচিবালয়। ফাইল ছবি
একই দিনে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি। এরপর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই প্রজ্ঞাপনের একটি অংশ বাতিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনে বিরল ঘটনা হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে কারণ হিসেবে শুধু 'জনস্বার্থ' উল্লেখ করা হলেও, এর নেপথ্য নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। প্রশ্ন উঠেছে—পদোন্নতির আগে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছিল কি? শেষ মুহূর্তে নতুন কোনো তথ্য এসেছে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছিল সমন্বয়ের ঘাটতি?
গত ৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উপসচিব মো. মাইনুল হক ভূঁইয়ার নামও ছিল। কিন্তু একই দিন জারি করা আরেকটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শুধু তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অংশটি বাতিল করা হয়। কেন এই সিদ্ধান্ত—সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নীরবতায় প্রশাসনে কয়েকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
প্রথমত, পদোন্নতির আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রশাসনিক রেকর্ড ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত তথ্য কি সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা হয়েছিল?
দ্বিতীয়ত, যদি যাচাই সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে একই দিনে প্রজ্ঞাপন বাতিলের প্রয়োজন কেন হলো?
তৃতীয়ত, যদি শেষ মুহূর্তে নতুন তথ্য এসে থাকে, তাহলে সেই তথ্য আগে কেন পাওয়া যায়নি?
চতুর্থত, পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের তদবির বা পাল্টা তদবিরের প্রভাব ছিল কি না—এ প্রশ্নও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গোয়েন্দা তথ্যে ঘাটতির অভিযোগ
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা, যারা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি নন, দাবি করেন— পদোন্নতির আগে বিভিন্ন সংস্থার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা মতামত নেওয়া হয়। যদি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর তা বাতিল করতে হয়, তাহলে অন্তত দুটি সম্ভাবনা সামনে আসে—হয় তথ্য সংগ্রহে বিলম্ব হয়েছে, নয়তো সিদ্ধান্ত গ্রহণের শেষ পর্যায়ে নতুন তথ্য এসেছে।
তবে এই দাবিগুলো সরকারিভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত?
প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় যদি কার্যকর না হয়, তাহলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। একজন কর্মকর্তা বলেন, "প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে সব তথ্য টেবিলে থাকার কথা। পরে সিদ্ধান্ত বদলানো প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর।"
'তদবির সংস্কৃতি' কি এখনও প্রভাব ফেলছে?
পদোন্নতি এলেই প্রশাসনে তদবিরের আলোচনা নতুন নয়। বর্তমান ঘটনাতেও কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তদবির ও পাল্টা তদবিরের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তবে এই ঘটনার সঙ্গে এমন কোনো প্রভাবের সম্পর্ক রয়েছে— এমন প্রমাণ বা সরকারি বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো গুঞ্জনের পর্যায়েই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকের মতে, পদোন্নতির আগে সব ধরনের যাচাই-বাছাই শেষ করেই প্রজ্ঞাপন জারি করা উচিত। তার ভাষ্য, প্রজ্ঞাপন প্রকাশের পর তা বাতিল করতে হওয়া প্রশাসনিক প্রস্তুতির দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাই নন, পুরো পদোন্নতি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
তিনি মনে করেন, গোয়েন্দা সংস্থা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের সমন্বয় আরও শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমানভাবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
প্রশাসনে কী বার্তা গেল
বর্তমান ঘটনাকে অনেক কর্মকর্তা একটি "প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কবার্তা" হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, একটি প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার অর্থ হলো সরকারের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। সেই সিদ্ধান্ত যদি একই দিনে পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচিত এ ধরনের ঘটনায় অন্তত সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা। এতে অযাচিত গুঞ্জন কমবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাও বাড়বে।
সব মিলিয়ে, একজন কর্মকর্তার পদোন্নতি বাতিলের ঘটনাকে ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, তার উত্তর এখনো অমীমাংসিত। সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না আসা পর্যন্ত গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতি, তদবির কিংবা সমন্বয়হীনতার মতো বিষয়গুলো কেবল আলোচনার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। তবে ঘটনাটি প্রশাসনের পদোন্নতি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে-এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দ্বিমত নেই।