× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নারী ও শিশু নির্যাতনের ‘মিথ্যা’ মামলা বাড়ছে

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার তরিকুল ইসলামের মেয়ে ফাতেমা (২১) একই উপজেলার শংকরপুর চকনোয়াই গ্রামের মতিবুল ইসলামের (৫০) বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ১১ জুলাই ধর্ষণ মামলা করেন। ট্রাইব্যুনাল সাতজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেন। এতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওই বছরের ২৭ আগস্ট সব আসামিকে খালাস দেন। তার আগে মামলা চলাকালেই শাহিনুর আলম নামের এক আসামি ফাতেমাকে বিয়ে করে খালাস পান।

এদিকে মিথ্যা মামলার কারণে শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে দাবি করে ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর ফাতেমার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী মতিবুল। অভিযোগটি আমলে নিয়ে মিথ্যা মামলা করায় বিচারক ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি ওই নারীকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন । 

নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর মামলায় এরকম হয়রানির পরিসংখ্যান বেশ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। অনেকের মতে, নারী নির্যাতন মামলা প্রতিপক্ষ দমনের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের মধ্যে এ ধরনের মামলার বিস্তার বেশি। আইন পেশায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পর্শকাতর এ বিষয়কে ঢাল বানিয়ে প্রতিপক্ষ দমনের প্রচণ্ড অনৈতিক এ অনুশীলনের কারণে প্রকৃত নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর ওপর সমাজের বিরূপ ধারণা তৈরি হচ্ছে।

মিথ্যা মামলার আরও দুটি ঘটনা

২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার পাওতা গ্রামের এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নলছিটি থানায় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন এক (২৩) নারী। মামলায় তিনি উল্লেখ করেন, একই বছরের ২১ নভেম্বর একটি ভাড়া বাসায় তাকে ধর্ষণ করেন ওই ব্যবসায়ী। এতে ওই ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রায় দুই মাস কারাভোগ করে জামিনে মুক্তি পান তিনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নলছিটি থানার উপ-পরিদর্শক কে এম মফিজুর রহমান ২০২৪ সালের ১ জুলাই আদালতে মামলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ফরেনসিক প্রতিবেদনে ধর্ষণের সত্যতা পায়নি। এরপর ওই নারীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণ মামলার অভিযোগ এনে মামলা করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী। ঝালকাঠি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটি করা হয়। ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল বিচারক জামিন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ‘মিথ্যা’ মামলা করার অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পর চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার আধারমানিক গ্রামের বাসিন্দা সায়রা বানু নামে এক নারীকে তিন বছরের সাজা দিয়েছে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায় ৫৫ বছরের সায়রা বানু তার সৎছেলে মাহবুবুল আলমসহ চারজনের বিরুদ্ধে শ্লীতাহানির অভিযোগে মিথ্যা মামলা করেছিলেন। পরে মাহবুবুল আলম মিথ্যা মামলার অভিযোগে সায়রা বানুর বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলার বিচার শেষে আদালত আসামি সায়রা বানুকে ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেন। মাহবুবুলের পাল্টা মামলায় বলা হয়, পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার জন্য সৎমা সায়রা বানু মিথ্যা মামলা দিয়ে মাহাবুবুলকে হয়রানি করেছে এবং ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যগ্রহণে তার প্রমাণও মেলে।

আইন কী বলছে

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২০ ও ২০২৩) নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ, অপহরণ, যৌতুক ও দহনকারী পদার্থ নিক্ষেপের মতো অপরাধ দমনের জন্য একটি বিশেষ আইন। এই আইনে দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি (যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড) এবং ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত ও বিচার শেষ করার বিধান আছে। তবে বাস্তব ক্ষেত্রে তা ৩.৭ বছরের বেশি সময় নিতে পারে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়। ২০২৫ সালের সংশোধিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী ধর্ষণ ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান কঠোর করা হয়েছে। ভুক্তভোগী, তার আত্মীয় বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থানায় মামলা করতে পারে, অথবা সরাসরি ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করা যায়।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট তৌহিদুর রহমান চৌধুরী তুষার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়েরের সময়ই সেটি সত্য নাকি মিথ্যা তা নিশ্চিতভাবে বোঝার সুযোগ থাকে না। তাই কোনো বিচারপ্রার্থীকে প্রাথমিক পর্যায়ে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী অভিযোগ গ্রহণের পর তদন্ত, বিচার ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কেবল একটি মামলার সত্যতা নির্ধারণ সম্ভব”। তিনি আরও বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর কেউ খালাস পান, তখন মামলাটি মিথ্যা ছিল কি না সেটি আদালতের রায়ে প্রতীয়মান হয়”।

গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. শামছুল হক ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এ মামলাগুলো সাধারণত পুলিশি ব্যাপার এবং তারা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়ে এই মামলাগুলো নেয়। পরবর্তীতে দেখা যায় এসবের অনেক মামলা মিথ্যা এবং আসামি খালাস হয়ে গেছে। পরবর্তীতে যারা এ ধরনের ভুয়া মামলা করে তাদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা যায়। মামলা বেশি হওয়ার পেছনে থানা পুলিশের প্ররোচনা থাকে। এ ছাড়া অর্থের কারণে প্রলুব্ধ হয়ে তারা এই কাজ করে। যারা মামলা করে তারাও কোনো না কোনো স্বার্থে করে। সামাজিকভাবে এটার ব্যাপারে যেমন সচেতনতা দরকার, তেমনি মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু নিয়মকানুন দরকার”।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতনের মিথ্যা মামলা দায়েরের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তবে সংখ্যা যাই হোক মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়েরকারীকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে মিথ্যা মামলার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গিয়ে যেন সত্যিকারের মামলাগুলো গুরুত্ব না হারিয়ে ফেলে”।

আইনজীবী ব্যারিস্টার বিএম লিপি আকতার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতনের মিথ্যা মামলা হচ্ছে এটা সত্য, তবে নারীদের ওপর অত্যাচার করা হচ্ছে এটাও মিথ্যা না। মিথ্যা মামলার লাগাম টেনে ধরার ক্ষেত্রে প্রমাণ দাখিলের সত্যতার বিষয়ে থানা ও আদালতকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে অভিযোগকারীর মেডিক্যাল সার্টিফিকেট (এমসি) থাকতে হবে এবং এ”টি সঠিক কি না তা যাচাই করে তারপর মামলা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কনক্রিট ডকুমেন্ট বা অকাট্য তথ্যপ্রমাণাদি ছাড়া বিবাদীকে হয়রানি করা উচিত না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন মামলা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইনের ১৭ ধারা অনুযায়ী এই আইনে মিথ্যা মামলা বা অভিযোগ দায়ের করলে অভিযোগকারীকে অনধিক ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হতে পারে। আদালত চাইলে মিথ্যা মামলার শিকার ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য মামলাকারীকে নির্দেশ দিতে পারেন”।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সংগীতশিল্পী দিঠি আনোয়ার প্রতিদিনের বাংলাদেশ বলেন, “এসব মামলা গ্রহণের আগে থানাকে সংশ্লিষ্টদের সঠিক তদন্ত ও সত্যতা ‘ভেরিফিকেশন’ করতে হবে। মিথ্যা মামলা দায়ের করা একটি মানসিক বিকৃতির লক্ষণ। এ দৈন্য থেকে কতিপয় নারী ও তাদের অভিভাবকদের বেরিয়ে আসতে হবে”। 


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা