গ্রাফিক্স:প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে আবারও উগ্রবাদী রাজনৈতিক তৎপরতা বিস্তারের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি দেশের ১৫ জেলায় সাদা-কালো কালেমা পতাকা ওড়ানো ও মিছিলের ঘটনা সেরকম ইঙ্গিতই দিচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কারাগার থেকে জঙ্গি তৎপরতায় অভিযুক্ত অনেকেই মুক্তি পায়। এরা আবারও জঙ্গিদের সংগঠিত করার কাজে লিপ্ত হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এমন কিছু কার্যক্রম এবং বক্তব্যও এসেছে, যার মধ্যে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির লক্ষণ রয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে হলেও সনাতন ধর্মের জন্য আলাদা প্রদেশ তৈরির বক্তব্য এসেছে। গাইবান্ধায় রামমন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করেও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্র থেকে সামাজিক মাধ্যমে রংপুর বিভাগ দখল করে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, একসময় যে ব্যাপক জঙ্গি ও উগ্রবাদী রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা দিয়েছিল, তা এখন আর নেই। নতুন করে যাতে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা না দেয়, সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। অন্যদিকে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় উগ্রতাবাদ ও ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক পাল্টাপাল্টি তৎপরতা, কোনোটিই রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না। দেশকে সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাখতে এবং ধর্মীয় উগ্রতাবাদ ঠেকাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, নাগরিকদেরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তর জানাচ্ছে, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো একটি বা বিশেষ পক্ষ নয়, সব ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বিবেচনায় নিয়েই পুলিশ এ ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে কোনো পক্ষ যদি বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে। তাই সব ধরনের উগ্র বক্তব্য, অনলাইন প্রচারণা, অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিরপেক্ষভাবে তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।’
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের বার্তা, পতাকা ওড়ানো, পতাকা নিয়ে মিছিল ও প্রচার চালানোর বিষয়টি সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও নজরে এসেছে। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। বিশেষত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বিষয়টি মারাত্মক নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত ১৫টি জেলার ২৪টি সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে এ কার্যক্রম চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট আইডিগুলো শনাক্ত করে তাদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রতীকের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা রয়েছে। তবে কোনো প্রতীক বা পতাকা যদি উগ্রবাদী সংগঠনের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সেটি আলাদাভাবে বিশ্লেষণের বিষয়। এ কারণেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার এলাকায় ‘মাদানী ব্র্যান্ড’ ও তামিম আল আদনান নামের আইডি থেকে পতাকা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে পোস্ট দেওয়া হয়। এসব পোস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমা পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানানো হয়। তদন্তকারীরা বলছেন, এর পেছনে কোনো সংগঠিত নেটওয়ার্ক, উগ্রপন্থী মতাদর্শ, আর্থিক লেনদেন বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
গাইবান্ধায় রামমন্দির নির্মাণ ঘিরে বিতর্ক : ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণকে ঘিরে আলোচনায় এসেছে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী। সেখানে ২৮ ফুটের শিবমূর্তি ও ৫৩ ফুটের কৃষ্ণমূর্তির পর এই রামমূর্তি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হয়েছে আলোচনা ও বিতর্ক। স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, এত বড় স্থাপনা নির্মাণে অর্থের উৎস, উদ্যোক্তাদের ভূমিকা এবং এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে গত ১১ জুন থেকে এই রামমূর্তি নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা হিসেবে আলোচনায় আসা হরিদাস চন্দ্র তরণীর অতীত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, অতীতে তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা রয়েছে। তবে হরিদাস এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গণভবন থেকে মন্দির প্রকল্প : সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, গণভবনে এসি মেরামতের কাজ করার সূত্রে হরিদাসের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। হরিদাস দাবি করেছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবজি সরবরাহ করে তিনি বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করেছেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি তিনি দেখাতে পারেননি। এ ছাড়া ২০২২ সালে র্যাবের একটি অভিযানের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। পলাশবাড়ীর মন্দির কমপ্লেক্স নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং বাইরের মানুষের যাতায়াত নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করা নয়, বরং প্রকল্পের অর্থায়ন, আইনগত বিষয় এবং সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার করাই তদন্তের মূল লক্ষ্য। রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন, গাইবান্ধা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না।
আইনজীবীর সাক্ষাৎকারে আলাদা প্রদেশ : গাইবান্ধার রামমূর্তি স্থাপন নিয়ে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির মধ্যেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট চৈতালী চক্রবর্তীর বক্তব্য ঘিরে। একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি তোলা হতে পারে। তার বক্তব্যের পর রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘এমন বক্তব্য দেশে বিভক্তির ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের বক্তব্যের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদও বলেন, ‘উস্কানিমূলক বক্তব্য দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হতে পারে।’ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ূম বলেন, ‘এ ধরনের বক্তব্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।’ তার মতে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘কোনো সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব। কিন্তু বিভাজনমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দুই পক্ষের কার্যক্রমই পুলিশের নজরে এসেছে। এরই মধ্যে পোস্টদাতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন ঊর্ধ্বতনরা। পাশাপাশি মন্দির নির্মাণ ও আলাদা প্রদেশ সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে পুলিশের মাঠ পর্যপায়ের সদস্যদের।’