রাজস্ব হিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়
ফাইল ছবি
ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকালীন তথ্য সংগ্রহ ও উপস্থাপনকে ঘিরে প্রশাসনিক অঙ্গনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী সদর দপ্তর, বিভাগীয় কার্যালয় এবং জেলা পর্যায়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য পাঠানোর কথা থাকলেও বাস্তবে কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি পদের তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। অন্য পদে কর্মরতদের তথ্য বাদ পড়ায় বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, চাহিদাকৃত তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রকৃত জনবল, কর্মকাল এবং প্রশাসনিক বাস্তবচিত্র সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত। কিন্তু তথ্য আংশিকভাবে পাঠানোয় সেই উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্দেশনা ছিল সব স্তরের তথ্য দেওয়ার
ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) কার্যালয়ের সদর দপ্তরে মোট আটটি পদ রয়েছে। এগুলো হলো হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব), সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (প্রশাসন), সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (অডিট), হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব), অডিটর (রাজস্ব), অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, ড্রাইভার এবং অফিস সহায়ক।
এ ছাড়া দেশের আটটি বিভাগীয় কার্যালয়ে রয়েছে পাঁচটি করে পদ-সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব), হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব), অডিটর (রাজস্ব), অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক এবং অফিস সহায়ক।
অন্যদিকে জেলা পর্যায়ের প্রতিটি কার্যালয়ে রয়েছে তিনটি পদ- হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব), অডিটর (রাজস্ব) এবং অফিস সহায়ক।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, সিনিয়র সচিবের নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য ছিল সব স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মকালীন তথ্য একত্রে সংগ্রহ করে প্রশাসনিক মূল্যায়নের জন্য উপস্থাপন করা। তবে যে তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, সেখানে শুধু সহকারী হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) এবং হিসাব তত্ত্বাবধায়ক (রাজস্ব) পদে কর্মরতদের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অডিটর, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, ড্রাইভার এবং অফিস সহায়কসহ অন্যান্য পদে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য প্রেরিত তালিকায় স্থান পায়নি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো পদকে বাদ দেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত জনবল কাঠামো ও কর্মকাল সম্পর্কে অসম্পূর্ণ চিত্র তৈরি হয়। এর ফলে প্রশাসনিক মূল্যায়ন, জনবল ব্যবস্থাপনা কিংবা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কয়েকজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো সরকারি দপ্তর যখন নির্দিষ্ট তথ্য চায়, তখন তা পূর্ণাঙ্গ, নির্ভুল এবং নিরপেক্ষভাবে সরবরাহ করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্ব। তথ্য আংশিকভাবে উপস্থাপন করা হলে স্বাভাবিকভাবেই এর কারণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগের কেন্দ্রে হিসাব নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) কার্যালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কার্যালয় থেকে প্রেরিত তথ্যে প্রয়োজনীয় সব তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রশাসনে বাড়ছে প্রশ্ন
প্রশাসনিক পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জনবলসংক্রান্ত তথ্য শুধু একটি তালিকা নয়; এটি প্রশাসনিক পরিকল্পনা, পদায়ন, পদোন্নতি, কর্মকাল মূল্যায়ন এবং নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তাদের মতে, কোনো তথ্য যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর উদ্দেশ্য কী ছিল, কার নির্দেশে তা করা হয়েছে এবং এতে কোনো প্রশাসনিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিল কি না-এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একজন সাবেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, সরকারি দপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে প্রশাসনের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সমতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মত
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি নথি প্রস্তুত বা তথ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নির্ভুলতা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের মৌলিক শর্ত।
তাদের ভাষ্য, অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে জনবল ব্যবস্থাপনা, সম্পদ বণ্টন এবং নীতিনির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, সরকারি দপ্তরের প্রতিটি পদই প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ। ফলে তথ্য সংগ্রহের সময় কোনো পদকে অযৌক্তিকভাবে বাদ দেওয়া হলে পুরো চিত্রই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
উত্তর খুঁজছে সংশ্লিষ্ট মহল
ঘটনাটি ঘিরে এখন প্রশাসনিক মহলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে। যদি নির্দেশনা অনুযায়ী সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য চাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে কেন কেবল নির্দিষ্ট কয়েকটি পদের তথ্য পাঠানো হলো? অন্য পদগুলোর তথ্য বাদ পড়ার কারণ কী? এটি কি প্রশাসনিক ত্রুটি, নাকি সচেতন কোনো সিদ্ধান্ত? আর যদি সচেতনভাবে এমনটি করা হয়ে থাকে, তাহলে তার দায়ভার কার?
এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের দাবি জোরালো হচ্ছে। তাদের মতে, বিষয়টি যথাযথভাবে তদন্ত করা হলে তথ্য উপস্থাপনের প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হবে এবং ভবিষ্যতে সরকারি তথ্য ব্যবস্থাপনায় আরও বেশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।