মাদকের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর অভিযান চলছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন খুচরা কারবারিরা। উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবা, গাঁজাসহ অন্যান্য মাদক। কিন্তু কদিন বাদেই একই এলাকায় আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে নতুন কোনো চক্র। গেণ্ডারিয়া, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী ঢাকার তিন থানায় আলোকপাত করেছেন বোরহানউদ্দিন মাহমুদ
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পরপরই গেণ্ডারিয়ার গণ্ডিগড় এলাকার দৃশ্যপট যেন চোখের সামনেই বদলে গেল। একটি সরু গলির মুখে দাঁড়িয়ে দেখছি, ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় অল্পবয়সী কয়েকজন তরুণের জটলা। মুহূর্তের মধ্যেই একটি মোটরসাইকেল এসে থামল, ইশারায় কিছু কথা হলো। হাতের মুঠোয় ছোট একটি পুঁটলি গুঁজে দিয়ে চোখের পলকেই হাওয়া হয়ে গেলেন আরোহী। চোখের সামনেই এমন বেপরোয়া মাদক কেনাবেচার এই দৃশ্য ঢাকার বুকে এক ভয়ংকর বাস্তবতারই প্রমাণ দেয়।
ঢাকার গেণ্ডারিয়া, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গেণ্ডারিয়ার গণ্ডিগড় এলাকায় প্রতিদিনই মাদক বিক্রেতা ও ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে খুচরা পর্যায়ে হেরোইন, ইয়াবা ও গাঁজার লেনদেন চলে। সরেজমিন গিয়েও তা দেখা গেছে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে শ্যামপুরের জুরাইন, বউবাজার, কমিশনার মোড় ও ওয়াসার গলির কিছু অংশে। স্থানীয়রা বলছেন, দিনের বেলাতেও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা ও মাদক সরবরাহের ঘটনা চোখে পড়ে। যাত্রাবাড়ী এলাকার বউবাজার-সংলগ্ন স্থানেও খুচরা পর্যায়ে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দিনের তুলনায় সন্ধ্যার পর কিছু এলাকায় সন্দেহজনক কারবারিদের আনাগোনা বেড়ে যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিক্রেতারা বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকেন। যেমন একটু আড়ালে কিংবা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাদক সরবরাহ করে থাকেন তারা।
মাদকের কারবার তরুণ সমাজকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্থানীয় বাসিন্দা তুহিন ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেছেন, পুলিশের অভিযানের পর কিছুদিনের জন্য মাদক বিক্রি কমে এলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা আবার আগের মতো শুরু হয়ে যায়। ফলে মাদকবিরোধী অভিযানের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
মাদক নির্মূলে অভিযান ও গ্রেপ্তার
মাদক নির্মূলে থানাগুলোর নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, গেণ্ডারিয়া থানায় গত এক মাসে ১০টি মামলা হয়েছে; অভিযান চালিয়ে ১৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সময় শ্যামপুর থানায় ১০ মামলা দায়ের হয়েছে; গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২০৮ জনকে।
গেণ্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “গণ্ডিগড় এলাকাটি তিনটি থানার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রির প্রবণতা রয়েছে। ধূপখোলা মাঠকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ইমরানকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং এ পর্যন্ত তার কয়েকজন সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে”।
শ্যামপুর থানার ওসি মো. মাহমুদুর রহমান এই প্রতিবেদককে বলেন, “মাদক নির্মূলে শ্যামপুর থানা পুলিশ শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি অনুসরণ করছে; মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে”।
দরকার সমন্বিত উদ্যোগ
দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান সত্ত্বেও মাদক কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার বিষয়টি এখন আলোচনায়। মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার করা গেলেও মাদক সরবরাহকারী, অর্থদাতা ও পুরো নেটওয়ার্কের মূল হোতাদের অনেক ক্ষেত্রেই আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে একটি চক্র ভেঙে গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই নতুন চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ঢাকা মেট্রোর (দক্ষিণ) ডেমরা সার্কেলের পরিদর্শক মো. ফজলুল হক খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “মাদক নির্মূলে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। নিয়মিত আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, মাদকের উৎস বন্ধ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে”।
তিনি বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ ও বিচারব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া কঠিন।”