গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
নীতিনির্ধারণী বোর্ডে গৃহীত সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য ঘোষণার মাধ্যমে কাজ দেওয়ার পাঁয়তারা করছে বিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।
শর্ত ভঙ্গের পাশাপাশি কাজে চরম অবহেলার কারণে পিজিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বোর্ড ২০২৫ সালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের সঙ্গে সম্পাদিত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে নিষিদ্ধ (টারমিনেট) করার সিদ্ধান্ত নেয়। পিজিসিবির নীতিমালা অনুযায়ী, নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ আগামী ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নতুন কোনো প্রকল্পে বা দরপত্রে এনার্জিপ্যাকের অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে অভিযোগ উঠেছে, পিজিসিবি তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন ও উপেক্ষা করে নিষিদ্ধ এনার্জিপ্যাককে প্যাকেজ-২ এবং প্যাকেজ-৩ প্রকল্পের আন্তর্জাতিক দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়নে যোগ্য ঘোষণা করেছে। অবশ্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি মাথায় রেখে এ ক্ষেত্রে এনার্জিপ্যাকও দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় কৌশল বেছে নিয়েছে। কোম্পানিটি সরাসরি অংশ নেওয়ার পরিবর্তে ‘রিভারি পাওয়ার অ্যান্ড অটোমেশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামের অপর একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বা জেভি করে দরপত্রে অংশ নিয়েছে। এ বিষয়ে চীনা একটি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে মন্ত্রীর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি পুনঃদরপত্রের মূল্যায়ন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ নভেম্বর প্রকাশিত দরপত্রের নথি থেকে দেখা গেছে, প্রতি মার্কিন ডলারের মূল্যমান ১১৮ টাকা হিসেবে প্যাকেজ-২-এর ৫১.৮৮ মিলিয়ন ডলারের মূল্য বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৬১২.১৮ কোটি টাকা। অন্যদিকে একই দরে প্যাকেজ-৩-এর ১৬.৯৬ মিলিয়ন ডলারের মূল্য দাঁড়ায় বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০০ কোটি থেকে ২০৩.৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুটি প্যাকেজ মিলে এই প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৮০০ কোটি টাকার বেশি।
এদিকে পিজিসিবি জানাচ্ছে, বিদেশি অর্থায়নে হতে যাওয়া এই প্রকল্পের দাতা সংস্থাকে এনার্জিপ্যাকের সঙ্গে চুক্তি বাতিল ও নিষিদ্ধের বিষয়টি জানানোর পরও তারা এতে কোনো আপত্তি তোলেনি। তা ছাড়া দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব নীতিমালা থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের কোনো বিধিনিষেধ তাদের ওপর কার্যকর হয় না। তাদের পক্ষ থেকে অনাপত্তি থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে যোগ্য হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। এ ছাড়া দরপত্রে মূল অংশীদার না হয়ে অন্যদের সঙ্গে জেভি করে এনার্জিপ্যাক দরপত্রে অংশ নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই বলে মনে করছে তারা।
তবে বোর্ডের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নিষিদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য করার ‘নৈতিক’ অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বোর্ডের সদস্যরা। এ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত বলেও মনে করছেন তারা। তাদের মতে, কাজে অবহেলা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে বিপুল পরিমাণ অর্থের এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হলে তা ঠিক সময়ে বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা পালনে ব্যর্থতা
বিভিন্ন নথি ও পিজিসিবির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ‘অ্যাডভান্স পেমেন্ট গ্যারান্টি’ (এপিজি) জমা দিতে ব্যর্থ হওয়া, চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রয়োজনীয় বীমা সম্পন্ন না করা এবং দীর্ঘ সময় ধরে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা ইত্যাদি গুরুতর কারণে পিজিসিবি থেকে এনার্জিপ্যাককে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৩০ মাস মেয়াদি ওই চুক্তির ২৩ মাস পেরিয়ে গেলেও এনার্জিপ্যাক আংশিক ভূমি উন্নয়ন সম্পন্ন করা ছাড়া নির্ধারিত ৭টি সাইটের একটিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। চুক্তি বাতিলের পেছনে বিনা নোটিসে কাজ বন্ধ রাখা, পাওয়ার গ্রিড থেকে কাজ পুনরায় শুরু করার জন্য বারবার নোটিস দেওয়ার পরও কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সেবা দিতে অক্ষমতার মতো কারণগুলোও ভূমিকা রেখেছে। সার্বিকভাবে এনার্জিপ্যাকের ‘নন-পারফর্মিং’ বা অকার্যকর ভূমিকার কারণেই পিজিসিবি পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী বোর্ড সভায় তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের এবং তাদের ডিফল্ট ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে পিজিসিবির কতিপয় কর্মকর্তার মতে, করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এনার্জিপ্যাক বেকায়দায় পড়ে যায়। এ কারণে কোম্পানিটিকে এমন বিপর্যয়ে পড়তে হয়েছে। তাদের মতে, বিভিন্ন সময় বিদ্যুৎ খাতের হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি বা গোলযোগের সময় এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখা সকলের দায়িত্ব বলে মনে করেন তারা।
বাতিল হয় তিনটি প্রকল্প
এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের অধীনে থাকা তিনটি বড় প্রকল্পের চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৫ সালে বাতিল করা হয়। বাতিল হওয়া এ তিনটি উল্লেখযোগ্য চুক্তি হলোÑ ঢাকা অ্যান্ড ওয়েস্টার্ন জোন ট্রান্সমিশন গ্রিড এক্সপেনশন প্রজেক্ট (প্যাকেজ-৮); ক্যাপাসিটি এনহান্সমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটর ব্যাংক ইন্সটলেশন (প্যাকেজ-২, লট-১) এবং ক্যাপাসিটি এনহান্সমেন্ট অ্যান্ড ক্যাপাসিটর ব্যাংক ইন্সটলেশন (প্যাকেজ-২, লট-২)। এই চুক্তি বাতিলের বিষয়টিকেই ভিত্তি ধরে পাওয়ার গ্রিডের বোর্ড সভা এনার্জিপ্যাককে তিন বছরের জন্য অর্থাৎ ২০২৮ সাল পর্যন্ত দরপত্রে অংশগ্রহণে অযোগ্য বলে গণ্য করে।
একাধিক নথি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালনা পর্ষদের ৬১২/২০২৫ নং সভায় (আলোচ্যসূচি-২১ : বিবিধ-৩) ঠিকাদার ও পরামর্শকদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ওই সভাতেই এনার্জিপ্যাককে নিষিদ্ধ করা হয়। ওই বোর্ড সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো ঠিকাদার অকার্যকর ভূমিকার জন্য চুক্তি বাতিলের শিকার হলে তাকে ন্যূনতম তিন বছর দরপত্রে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা উক্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য মূল ঠিকাদার বা অংশীদারÑ উভয় হিসেবেই কার্যকর হবে। সেই সময় পাওয়ার গ্রিডের বোর্ড সভা থেকে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে এই শর্তটি দরপত্র বিজ্ঞপ্তি বা দলিলে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়। যাতে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিতে না পারে।
অভ্যন্তরীণ প্রভাব ও যোগসাজশের অভিযোগ
অভিযোগ উঠেছে যে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা মহলের সহায়তায় এই ‘নন-পারফর্মিং’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিকে আবারও নতুন প্রকল্পে (যেমনÑ প্যাকেজ-২) দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। যা সরাসরি বোর্ডের গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপন্থী। বিভিন্ন সূত্র জানাচ্ছে, এনার্জিপ্যাকের অনিয়ম এবং বোর্ডের সিদ্ধান্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীর কাছে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি) লিখিতভাবে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এর মধ্যে প্যাকেজ-২ এবং প্যাকেজ-৩-এর পুনঃদরপত্রের মূল্যায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদান প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া অযোগ্য ঘোষণা করার বদলে এনার্জিপ্যাককে কেন ‘রেসপনসিভ’ বা যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হলো, সে বিষয়ে একটি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র তদন্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। বিষয়টি এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থেকে সরকারের উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অবহিত করা হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, প্রকল্পের দাতা সংস্থা এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শেই এ্যানার্জিপ্যাককে যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
যা বলছেন বোর্ড সদস্যরা
এ প্রসঙ্গে বোর্ডের সদস্য ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “এডিবি কিংবা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হওয়া প্রকল্পগুলোতে একটু ভিন্নতা থাকে। অনেক সময় তাদের শর্ত গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে টেন্ডারে যারা অংশ নেয়, তাদের সবার তথ্য পাঠাতে হয়। তারা তখন পরামর্শ ও মতামত দেয়। আর এডিবি ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রজেক্টগুলোতে এটা বলাই থাকে, তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এ ধরনের কিছু ইস্যু থাকার পরও ঘটনাটি আমরা আরেকটু যাচাই-বাছাই করে দেখব। পরবর্তী বোর্ড সভায় এটি নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা হবে। সবার মতামতের ভিত্তিতে আলোচনা করে যেটা ফিজিবল সেটাই হবে”।
জানতে চাইলে বোর্ডের আরেক সদস্য ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. সবুর হোসেন বলেন, “আমি তখন বোর্ডের সদস্য ছিলাম না। তবে যেটুকু জানতে পেরেছি তাতে বলা যায়, কাজে অবহেলার কারণে বোর্ড থেকে যে প্রতিষ্ঠানকে তিন বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে, পিজিসিবি সেই প্রতিষ্ঠানকেই যোগ্য ঘোষণা করেছে। নৈতিকভাবে এ কাজ করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কী কারণে এটা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা উচিত”।
পিজিসিবির যুক্তি
এ প্রসঙ্গে পিজিসিবি ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান গত রবিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “একটা সিদ্ধান্ত ছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, যে প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন, আমাদের সঙ্গে যদি পারফরম্যান্স খারাপ হওয়ার কারণে টার্মিনেশন হয়, তবে সেটার সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করা যাবে না। তবে এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র নিজস্ব প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ এডিবি বলছে যে, তোমার এই ডিসিশনে আমার কিছু আসে যায় না”। তিনি বলেন, “এডিবি বা বিশ্বব্যাংকের মতো বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব নীতিমালা থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের কোনো বিধিনিষেধ তাদের ওপর কার্যকর হয় না। ওদের নিজস্ব প্রসিডিউর আছে। কাউকে যদি ডিমার করতে হয় বা কোনো ক্লজ ঢুকাতে হয়, ওদের নিজস্ব প্রসিডিউর ফলো করতে হবে। তবে আপত্তি আসার পর বিষয়গুলো সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি এখনও সরকারের উচ্চপর্যায়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে”। পুরো প্রক্রিয়াটি এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় এ নিয়ে বিতর্ক করাকে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ মনে করেন আবদুর রশিদ খান।