মনির ফয়সাল, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে
গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বর্ষা এলেই পাহাড়ধসের আশঙ্কায় প্রশাসনের সতর্কতা, মাইকিং ও আশ্রয়কেন্দ্র খোলার উদ্যোগ দেখা যায়। তবে বছরজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারী হাজারো পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া বা পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাবে পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের অন্তত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে গত বছর ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ বসতি ছিল। নতুন জরিপ না হলেও প্রশাসনের ধারণা, এ সংখ্যা আরও বেড়েছে।
মঙ্গলবার বেলা ৩টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা ১৯৮৩ সালের পর সর্বোচ্চ। এ অবস্থায় আবহাওয়া অধিদপ্তর পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের সতর্কতা জারি করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সোমবার জেলা প্রশাসন নগরীর বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানায় এবং আশ্রয়কেন্দ্র খোলে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।
২০০৭ সালের ট্র্যাজেড
২০০৭ সালের ১১ জুন ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ গঠন করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ২৬ মে কমিটির ৩১তম সভা অনুষ্ঠিত হলেও ঝুঁকিপূর্ণ বসতির হালনাগাদ তালিকা তৈরির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
কেন পাহাড়েই বসতি
বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মস্থলের কাছাকাছি অবস্থান, কম ভাড়া এবং সহজে থাকার জায়গা পাওয়ায় পাহাড়ে অনানুষ্ঠানিক বসতি গড়ে উঠেছে। বাসিন্দাদের বেশিরভাগই রিকশাচালক, পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। বিকল্প আবাসনের সামর্থ্য না থাকায় তারা ঝুঁকি জেনেও সেখানে বসবাস করছেন।
আকবর শাহ থানার ফয়স লেক এলাকার পাহাড়ে বসবাসকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মোহাম্মদ মোবারক বলেন, এখানে আমরা অল্প টাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে পারি। অন্য জায়গায় বাসাভাড়া আমাদের সাধ্যের বাইরে। আর বাঁচা-মরা তো সব উপরওয়ালার হাতে।
একই এলাকার বাসিন্দা রুবি আক্তার বলেন, আমরা এই পাহাড় ছেড়ে আর কোথায় যাব? এখানেই ছোট থেকে বড় হয়েছি। তবে বর্ষা এলেই মনে ভয় জাগে। আমরাও চাই নিরাপদ কোনো জায়গায় গিয়ে থাকতে, কিন্তু সেই সামর্থ্য তো আমাদের নেই।
সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ
পরিবেশ ও যুব উন্নয়নমূলক সংগঠন এসওয়াইডিএফ-এর সভাপতি এমকে মনির বলেন, পাহাড়ে অবৈধ বসতি অপসারণে সারা বছর তৎপরতা দেখা যায় না। বর্ষা এলেই কেবল মাইকিং ও সাময়িক উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে বিভিন্ন সংস্থা থাকলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনার হালনাগাদ তথ্য এখনও নেই। আগামী ১৩ জুলাই কমিটির পরবর্তী সভা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, পাহাড়ধসের আশঙ্কা বিবেচনায় দুই মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পাঁচটি এলাকাকে পাঁচটি জোনে ভাগ করে এসি ল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি মাইকিং, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে গিয়ে বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে।
চট্টগ্রাম মহানগরে আটটি প্রতিষ্ঠানকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেখানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে তিনি বলেন, কাউকে জোরপূর্বক আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব নয়।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেন, পাহাড়ের অবৈধ বসতি উচ্ছেদে রাজনৈতিক ছত্রছায়া বড় বাধা। এ কারণে প্রশাসন চাইলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন সারা বছর সমন্বিতভাবে কাজ করলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
তার ভাষ্য, স্বল্প খরচে থাকার সুযোগ পাওয়ায় দরিদ্র মানুষ এসব বসতিতে থাকেন। অন্যদিকে, যারা এসব ঘর ভাড়া দেন, তারাও আর্থিকভাবে লাভবান হন। ফলে দুপক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকায় উচ্ছেদ কার্যক্রম জটিল হয়ে পড়ে।
পুনর্বাসন ছাড়া সমাধান নয়
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশ থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়া একদিনের কাজ নয়; এটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। উচ্ছেদের পাশাপাশি পুনর্বাসন নিশ্চিত না করলে মানুষ আবারও একই স্থানে ফিরে আসে।
তিনি বলেন, সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ এবং পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কোথায় কত বসতি
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরের ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে গত বছর ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ বসতি ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বসতি আকবর শাহ থানার ফয়স লেক এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে, যেখানে প্রায় ৪ হাজার ৬৪৭ পরিবার বসবাস করছে। এ ছাড়া মতিঝর্ণা ও বাটালীহিল, কৈবল্যধাম হাউজিং এস্টেট, ষোলশহর, লেকসিটি আবাসিক এলাকা, লালখানবাজার, নাগিন পাহাড়, মধুশাহ পাহাড়সহ বিভিন্ন স্থানে শত শত পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।
প্রশাসনের এই হিসাবের বাইরে রয়েছে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মালিকানাধীন সাতটি পাহাড়। রেলওয়ে ভূ-সম্পত্তি বিভাগের তথ্যমতে, এসব পাহাড়ে ৫ হাজার ৩৩২টি পরিবার বসবাস করছে। তিন দশকের বেশি সময় ধরে এসব পাহাড়ে বসতি গড়ে উঠেছে এবং সময়ের সঙ্গে অবৈধ বসতির সংখ্যা বেড়েই চলেছে।