ঢাকার সড়কে রাইড শেয়ারিং চালকের অসাবধানতার শিকার অনেকেই। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চলতি মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত পেয়ে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তানিয়া হামিদ (ছদ্মনাম)। চিকিৎসক জানিয়েছে, তার হাঁটুর বাটি ফেটে গেছে। চিকিৎসা করতে গিয়ে এর মধ্যেই দুই লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। সামনে আরও খরচ করতে হবে।
বেসরকারি কর্মকর্তা বকাউল আলমের (ছদ্ম নাম) অবস্থা আরও খারাপÑ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বাইক দুর্ঘটনায় তার পায়ের হাড় মারাত্মকভাবে ভেঙে যায়। ডান পা তার অকেজো হয়ে পড়েছে।
তানিয়া হামিদ এবং বকাউল আলম দু’জনেই ঢাকার সড়কে রাইড শেয়ারিং চালকের অসাবধানতার শিকার। ভুক্তভোগী দু’জন জানান, বাইক চালনায় তাদের চালকরা দক্ষ ছিলেন না। দুর্ঘটনার পর দু’জন চালকই পালিয়ে যান। অ্যাপসের বাইরে মৌখিক চুক্তিতে গন্তব্যের জন্য ভাড়া ঠিক করায় চালকদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের মাধ্যমও নেই। রাজধানীতে অহরহ ঘটছে এ ধরনের দুর্ঘটনা। চলতি মাসে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের এক হিসাব মতে, দেশে গত জুন মাসে ১৪৫টি মোটর বাইক দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ৩০.৫৯ শতাংশ ঘটছে বাইক দুর্ঘটনায়।
এদেশে রাইড শেয়ারিং বাইক চালকের নির্দিষ্ট কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শুধু ঢাকা শহরেই রাইড শেয়ারিং পেশায় যুক্ত আছেন প্রায় ১০-১৫ লাখের বেশি চালক। পাঠাও, উবার, ওভাই এবং সহজÑএর মতো প্ল্যাটফর্মগুলোতে নিবন্ধিত চালকের সংখ্যা কয়েক লাখ হলেও, বিপুলসংখ্যক চালক সরাসরি অ্যাপের বাইরে চুক্তিভিত্তিক রাইড চালান। সরকারের নিবন্ধন ও নজরদারির বাইরে থাকা এই বাইক চালকদের চলাচলে একদিকে সড়কে অলিখিত চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, অপরাধ সংঘটিত হলে এবং যাত্রীপ্রতারণার ঘটনা ঘটলে তাদের আইনের আওতায় আনার কাজটি কঠিন হয়ে পড়ছে। অভিযোগ উঠেছে, বাইক রাইড শেয়ারের নামে এক শ্রেণির চালক গভীর রাতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, কোনো অ্যাপসের আওতায় না থাকায় তারা অন্যায্যভাবে ভাড়া আদায় করছেন। এসব নিয়ে উত্তপ্তকর পরিস্থিতিও সৃষ্টি হচ্ছে। ভুক্তভোগী যাত্রীরা মনে করছেন, এসব বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে অ্যাপস ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকা জরুরি।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা দিতে পাঁচ লাখেরও বেশি বাড়তি বাইক প্রবেশ করায় দুটি সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
প্রথমত. ঢাকার সড়কে বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। বাইক চালকরা বিভিন্ন স্ট্যান্ডে জড়ো হওয়ায় সেখানে যাত্রী চলাচলেও প্রতিবন্ধকতা দেখা দিচ্ছে। তাদের অবস্থানের কারণে ফুটপাতের অনেকটা অংশেও চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সড়কে অনিয়ন্ত্রিত, অসংখ্য বাইকের আধিপত্যে অন্য সব যানবাহন চলাচলেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত. মফস্বল শহরের চালকরা জনবহুল ঢাকার সড়কে বাইক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। তাদের সঠিক প্রশিক্ষণ নেই। অনেকেরই লাইসেন্সের সব কাগজপত্রও নেই। এতে ঢাকাতে বাইক দুর্ঘটনা বাড়ছে।
যোগাযোগ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারা বাণিজ্যিকভাবে এবং কারা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে বাইকের রাইড শেয়ার করেন, তা নির্দিষ্ট করতে পারলে বাইকসৃষ্ট অপরাধ প্রবণতা ও দুর্ঘটনা কমানো যেত। পেশাদার রাইড শেয়ারকারী ও ব্যক্তিগত চালকদের একটি ডাটাবেজ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে থাকা জরুরি। এতে একদিকে অদক্ষ চালকদের ধাপে ধাপে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা যাবে। অন্যদিকে ছদ্মবেশি অপরাধী চক্র থাকলেও চিহ্নিত করা সহজ হতো। তবে বিআরটিএ সূত্র জানাচ্ছে, তাদের কাছে রাইড শেয়ারকারী চালকদের পরিপূর্ণ ডাটাবেজ নেই। যা আছে তা ৫ শতাংশের মতো হবে। ৯৫ শতাংশ চালক অ্যাপস ব্যবহার করেন না।
অ্যাপস ব্যবহারে অনাগ্রহী চালকরা
যানজট ও অ্যাপের অতিরিক্ত কমিশন এড়াতে অনেক চালক যাত্রীদের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি বা অফ লাইনে রাইড শেয়ার করে থাকেন। একজন চালক দৈনিক ৮-১০ ঘণ্টা কাজ করে বর্তমান বাজারমূল্যে ভালো আয় করতে পারেন। কিন্তু অ্যাপসগুলোর আওতায় চলাচল করলে শতকরা ৩০ টাকা কমিশন হিসেবে কেটে রাখে সংশ্লিষ্ট অ্যাপস কোম্পানি। এতে আয়ের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। সারাদিন এক হাজার টাকা আয় করলে কোম্পানিকে দিতে হয় ৩০০ টাকা। এর পর তেল-মবিল ও রাস্তার খরচ বাদ দিলে ৫০০ টাকাও উদ্বৃত্ত থাকে না।
গত সপ্তাহ জুড়ে কুড়িল বিশ্বরোড, মহাখালী, গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট, মিরপুর-১, ফার্মগেটসহ ঢাকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বাইক রাইড শেয়ারিংয়ে যুক্ত একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ৯০ শতাংশই অ্যাপস ব্যবহার করে রাইড শেয়ার করেন না। এই চালকদের বিআরটিএ রাইড শেয়ারিংয়ের অন্তর্ভুক্তিও নেই। অ্যাপস কোম্পানিগুলো রাইড প্রতি আয়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা কেটে রাখায় তারা অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং এড়িয়ে চলেন। কয়েকজন চালক জানান, অ্যাপস কোম্পানিগুলো অ্যাপস ব্যবহারে ১০ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশ কমিশন কাটলে তা গ্রহণযোগ্য বা সহনীয় হতো। তবে সরাসরি ‘ট্রিপ’ না পাওয়া গেলে অনেক চালক সে সময় অ্যাপস ব্যবহার করে থাকেন।
বাংলাদেশ সরকার নিয়ন্ত্রিত ‘রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা, ২০১৭’-এর অধীনে চালক ও রাইড শেয়ারিং কোম্পানিকে বিআরটিএ থেকে নিবন্ধন নিতে হয়।
নীতিমালার প্রধান শর্তাবলি হলো
সেবাদানকারী কোম্পানিকে বিআরটিএ থেকে এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট নিতে হয় এবং চালকদের অবশ্যই পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হয়। ব্যক্তিগত মোটরযান (কার, মাইক্রো, বাইক) রেজিস্ট্রেশন গ্রহণের পর অন্তত এক বছর অতিক্রান্ত না হলে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে ব্যবহার করা যাবে না। রাইড শেয়ারিং নীতিমালার আওতায় একজন মোটরযান মালিক মাত্র একটি গাড়ি বা মোটরসাইকেল পরিচালনার অনুমতি পাবেন। প্রতিটি রাইড জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকতে হবে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করা যাবে না।
সংঘবদ্ধ চালকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’ সংশোধন করে ‘নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২ নভেম্বর প্রস্তাবিত নীতিমালাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবিত নীতিমালায় ভাড়ার নতুন কাঠামোকে ‘সার্ভিসের বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ’বলে মন্তব্য করেছে ‘বাঁচাও রাইড পরিষেবা ঐক্য পরিষদ’। সংগঠনটি জ্বালানি খরচ, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও সার্ভিস পরিচালনার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সকল ক্যাটাগরির অনুমোদিত যানবাহনের জন্য একটি টেকসই ও ন্যায্য ভাড়া কাঠামো প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে।
বিআরটিএ পরিচালক শহীদুল্লাহ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা সংশোধন করার বিষয়টির কার্যক্রম চলমান আছে।
বিআরটিএ’র আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, চলমান নীতিমালা হালনাগাদ করতে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধিত নীতিমালায় দুটি বিষয় সংযোজন করা হবেÑ
প্রথমত. কত শতাংশ কমিশন কেটে নেওয়া হবে; দ্বিতীয়ত কত শতাংশ ভাড়া সংযোজিত হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, “অ্যাপস ব্যবহার করে বাইক রাইড শেয়ারিং পুরোপুরি চালু করা গেলে এই সেক্টরের অমিত সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান এ কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিআরটিএ-তে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা অ্যাপস মনিটরিংয়ের মতো টেকনিক্যাল বিষয়গুলো বোঝেন না। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার কারণেই মূলত রাইড শেয়ারিং নিয়ে উপযুক্ত নীতিমালা তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটিকে (বিআরটিএ) ঢেলে সাজাতে হবে। একটি সময়োপযোগী নীতিমালা তৈরি করতে হবে”।