জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফাইল ছবি
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পর্যায়ে আবারও বড় ধরনের রদবদলের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া বিতর্কিত কয়েকজন জেলা প্রশাসককে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করেছেনÑ এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে সরকার।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চলমান প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মাঠ প্রশাসনে মেধা, সততা ও পেশাদারত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং জেলা প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হয়নি, তবে ইতোমধ্যে কয়েকটি জেলায় ডিসি প্রত্যাহার এবং নতুন নিয়োগের মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ার আভাস পাওয়া গেছে।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম চার দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন গত ৬ মে শেষ হয়। প্রশাসনিক রীতিনীতি অনুযায়ী ডিসি সম্মেলনের পর মাঠ প্রশাসনে রদবদল হয়ে থাকে। এবারও একই ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা থাকলেও এখনও বড় পরিসরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে মাঠ প্রশাসনে ২৫, ২৭, ২৮ ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশাসনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলোর দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া যেসব কর্মকর্তাকে নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তাদের অনেককেই পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের নিয়োগ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জেলা প্রশাসক নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসনে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় একযোগে ৫৯ জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন জনপ্রশাসন সচিব ড. মোখলেস উর রহমানের নেতৃত্বে প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।
নিয়োগ বাতিলের দাবিতে সচিবালয়ে নজিরবিহীন বিক্ষোভ করেন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা। একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরবর্তীতে ডিসি নিয়োগ-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা ৯ জন কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন জেলাতেও এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ ও প্রতিবাদের ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, ওই নিয়োগ প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছিল।
সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডিসি নিয়োগে আগের বিতর্কের পুনরাবৃত্তি এড়াতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নতুন নিয়োগের আগে ২৮ ও ২৯তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। এরপরও বিভিন্ন জেলায় প্রত্যাশিত রদবদল এখনও সম্পন্ন হয়নি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যারা বিশেষ রাজনৈতিক সুপারিশে জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাদের বিষয়ে সরকার পুনর্মূল্যায়ন করছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও পরিবর্তন আসবে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে নেত্রকোণা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম হেলালীর প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, বর্তমান সরকার নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা অন্যায্য কোনো প্রভাবকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। মেধা, সততা ও দক্ষতাকেই একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অতীতে প্রশাসনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেনÑ এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কাজ শুরু করেছে।
সিলেটের ডিসি নিয়ে জটিলতা
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা সিলেটের জেলা প্রশাসক পরিবর্তন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার-সংক্রান্ত একটি বিতর্কের পর প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এরপর কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মু. রেজা হাসানকে সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও প্রজ্ঞাপন জারির প্রায় ১০ দিন পরও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি।
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক পিংকি সাহা বলেন, যোগদান-সংক্রান্ত বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে কোনো তথ্য নেই।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, সিলেটের নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে তার নিয়োগ নিয়ে সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর আপত্তি রয়েছে। ফলে সেখানে নতুন করে আরেকটি নিয়োগ হতে পারে বলে আলোচনা চলছে।
ধারাবাহিক প্রত্যাহার
জানা গেছে, গত কয়েক মাসে একাধিক জেলার জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার করেছে সরকার। গত ১ এপ্রিল পাবনা, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকদের প্রত্যাহার করে তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে ওই চার জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ১ মার্চ গাজীপুর, পঞ্চগড়, কুষ্টিয়া, নেত্রকোণা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার জেলা প্রশাসকদেরও প্রত্যাহার করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত নয়; বরং বড় ধরনের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, জেলা প্রশাসকের পদ কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; জাতীয় নির্বাচনের সময় তারাই রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। ফলে নির্বাচন সামনে রেখে জেলা প্রশাসনে সরকার সাধারণত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদায়ন করে থাকে। এরই অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে ২৩ জেলায় বড় ধরনের ডিসি রদবদল করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। বর্তমান সরকারও মাঠ প্রশাসনকে নিজেদের প্রশাসনিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে নতুন করে পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
কারা আসছেন নতুন দায়িত্বে
ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলায় নতুন জেলা প্রশাসক হিসেবে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর ও সংস্থায় কর্মরত উপ-সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে চট্টগ্রামে, বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পরিচালক এস এম মেহেদী হাসানকে লক্ষ্মীপুরে, পরিকল্পনা বিভাগের উপ-সচিব সৈয়দা নুরমহল আশরাফীকে মুন্সীগঞ্জে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. সাইফুর রহমানকে নেত্রকোণায়, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পরিচালক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে নওগাঁয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব মো. আনোয়ার সাদাতকে খাগড়াছড়িতে এবং রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মু. রেজা হাসানকে কুমিল্লায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া আরও বেশ কয়েকটি জেলায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, ভূমি মন্ত্রণালয়, দুদক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের মধ্যে কয়েকজনের নিয়োগ-পরবর্তী সময়ে বাতিলও হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, বর্তমানে একটি তালিকা ধরে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন চলছে। যাদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে বা যাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নতুন জেলা প্রশাসক নিয়োগে অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, মাঠ পর্যায়ে কাজের সক্ষমতা এবং পেশাগত গ্রহণযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, ঘন ঘন জেলা প্রশাসক পরিবর্তন মাঠ প্রশাসনের ধারাবাহিকতায় কিছুটা প্রভাব ফেললেও সরকার যদি স্বচ্ছ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের প্রতি জন-আস্থা বাড়বে। তবে নিয়োগ ও প্রত্যাহারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সূত্রগুলো বলছে, খুব শিগগির ডিসি পর্যায়ে আরও পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারে। ফলে দেশের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনিক নেতৃত্বে আবারও বড় ধরনের রদবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।