× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মনের ময়নাতদন্ত

প্রিয় দল হারলে ভক্ত কেন কাঁদে

জাহাঙ্গীর সুর

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ১৩:৪৮ পিএম

নরওয়ের বিপক্ষে প্রিয় দল ব্রাজিলের হারের পর নিউইয়র্ক সিটিতে হতাশ সমর্থকরা। ছবি: এএফপি

নরওয়ের বিপক্ষে প্রিয় দল ব্রাজিলের হারের পর নিউইয়র্ক সিটিতে হতাশ সমর্থকরা। ছবি: এএফপি

‘হারজিত চিরদিন থাকবেই’ জেনেও তো পরাজয়ে মন শক্ত রাখা যায় না। ফুটবল বিশ্বকাপে নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের পরাজয়ে বিশ্বব্যাপী দলটির ভক্তরা ভেঙে পড়েছেন। রেফারির শেষ বাঁশিটা বাজতেই মাঠে যেমন কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার, চোখ মুছতে দেখা গেল স্টেডিয়ামের দর্শকদের; সরাসরি সম্প্রচারিত খেলা দেখার সময় ছোট-বড় পর্দার সামনেও কান্নায় মুষড়ে পড়েন সমর্থকরা।

সাড়ে ১২ হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশেও একই দৃশ্য। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুবিন্দুটিকে আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টাও পরিলক্ষিত হয় কারও কারও ক্ষেত্রে। এত দূরের মাঠে কজন মানুষ খেলতে নেমে হেরে গেছে, অথচ বুকের ভেতর যে চিনচিনে, তীব্র অলক্ষ্য যন্ত্রণাটা মোচড় দিয়ে উঠছে, তা নিখাদ নিজের। কেন এমন হয়? আক্ষরিক অর্থেই একটা খেলা কেন আমাদের এতটা আবেগতাড়িত করে কান্নার অতল গহ্বরে ছুড়ে ফেলে দেয়? 

সাধারণ মানুষ একে স্রেফ পাগলামি বা অতি-আবেগ বলে উড়িয়ে দিতে পারেন, কিন্তু বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম ছুরির নিচে যখন আমরা এই অনুভূতির ময়নাতদন্ত করি, তখন বেরিয়ে আসে এক জটিল স্নায়বিক মনস্তত্ত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত স্নায়ুশল্যবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রিচার্ড মেঞ্জার নিজের জীবনের এক মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেছেন। ২০০৫ সালে বিখ্যাত ‘বুশ পুশ’ ম্যাচে যখন নটর ডেম দল উগ্র প্রতিদ্বন্দ্বী ইউএসসির কাছে শেষ মুহূর্তে হেরে যায়, তখন তিনি ডাইনিং হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দানবাকৃতির সব প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে শিশুদের মতো ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখেছিলেন। মেঞ্জারের মতে, আমরা যখন আমাদের প্রিয় দলকে কোনো বড় টুর্নামেন্টে হারতে দেখি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক একে কোনো দূরের ঘটনা বা স্রেফ বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং এটিকে অত্যন্ত ব্যক্তিগত এক ব্যর্থতা ও গভীর মনঃপীড়া (ট্রমা) হিসেবে বিবেচনা করে।

আমাদের মস্তিষ্কের গভীরে লুকিয়ে আছে অ্যান্টেরিওর সিঙ্গুলেট কর্টেক্স নামক এক অত্যন্ত সংবেদনশীল স্নায়বিক কেন্দ্র। এই অংশটির মূল কাজ হলো মানুষের মানসিক কষ্ট, সামাজিক বর্জন ও শারীরিক ব্যথার অনুভূতিগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করা। আপনি যখন নিজে কোনো বড় ধরনের শারীরিক আঘাত পান কিংবা চোখের সামনে নিজের প্রিয় কোনো মানুষকে মারাত্মক জখম হতে দেখেন, তখন আপনার মস্তিষ্কের এই অ্যান্টেরিওর সিঙ্গুলেট কর্টেক্স যেভাবে যন্ত্রণার তীব্র সংকেত পাঠায়, ঠিক একই স্নায়বিক পথ ধরে প্রিয় দলের পরাজয়ের বেদনাও সেখানে গিয়ে আঘাত করে। 

ফাংশনাল এমআরআই স্ক্যানের মাধ্যমে ফুটবলভক্তদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রিয় দলের বিপর্যয় দেখার সময় ভক্তদের মস্তিষ্কের এই অংশটি এতটাই তীব্রভাবে সক্রিয় হয়, যা আক্ষরিক অর্থেই বাস্তব জীবনে কোনো গুরুতর শারীরিক ট্রমা বা প্রিয়জন হারানোর কষ্টের সমতুল্য। 

অর্থাৎ নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের ওই হার ভক্তের অবচেতন মনের কাছে কোনো কাল্পনিক দুঃখ নয়, এটি রক্তমাংসের এক তীব্র ক্ষত। তানজানিয়ার তরুণ এলিসা গ্যাব্রিয়েল ব্রাজিলের বড় ভক্ত। দল হেরে যাওয়ার পর তার ‘হৃদয় ভেঙে গেছে’। হোয়াটসঅ্যাপে সোমবার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘এবার ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতবে। এ ব্যাপারে আমি প্রবল আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু [নরওয়ের কাছে] হেরে যাওয়াটা মানতেই পারছি না। খুবই খারাপ লাগছে।’ অবশ্য তিনি বলেন, ‘এটাই ফুটবল। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি।’

ঢাকায় স্ক্রিনে খেলা দেখছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা শোয়েব ইপ্তি। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেন, “এই হেরে যাওয়াটা মেনে নেওয়া একটু বেশিই কঠিন। কান্নায় চোখ ভিজে গিয়েছিল। নিজেকে হতাশ লাগছিল। তবুও ব্রাজিলের প্রতি ভালোবাসা সবসময়ই থাকবে”।

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, হারের এই কষ্টটা কেন সব সময় জয়ের আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি ভারী এবং দীর্ঘস্থায়ী মনে হয়? বিশেষ করে যখন ব্রাজিলের মতো পরাশক্তি কোনো অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলের কাছে আকস্মিকভাবে হেরে যায়, তখন কেন কান্নার তীব্রতা আকাশ ছুঁয়ে ফেলে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে নোবেলজয়ী চিন্তাবিদ ড্যানিয়েল কাহনেমান ও আমোস তেভারস্কির বিখ্যাত ক্ষতিভীতি তত্ত্বের (লস অ্যাভারশন) মধ্যে। এই আচরণগত অর্থনীতি ও মনস্তাত্ত্বিক মডেল অনুযায়ী, মানুষের মন কোনো কিছু পাওয়ার আনন্দের চেয়ে, কোনো কিছু হারানোর বা হাতছাড়া হওয়ার বেদনাকে প্রায় দ্বিগুণ মাত্রায় অনুভব করে। একে বলা হয় ‘২ অনুপাত ১’ অনুভূতি। অর্থাৎ প্রিয় দল জিতলে আপনি যতটুকু আনন্দিত হন, দলটির একটি আকস্মিক পরাজয় আপনাকে তার চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ গভীর মানসিক কষ্টের সাগরে ডুবিয়ে দেবে। যখন প্রত্যাশা আকাশচুম্বী থাকে, তখন সেই প্রত্যাশার পারদ থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ধাক্কাটা মস্তিষ্ক সহ্য করতে পারে না। স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কু) থেকে এই তীব্র বিচ্যুতিকে আমাদের নিউরোনগুলো এক বিশাল বিপর্যয় হিসেবে সংকেত দেয়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে চোখের জল আর রুদ্ধশ্বাসের কান্নায়।

কিংবদন্তি মার্কিন বাস্কেটবল খেলোয়াড় জেরি ওয়েস্ট একবার বলেছিলেন, ‘হারানোর বেদনা জেতার আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী। বিজ্ঞান আমাদের অবিকল এই সত্যটিই দেখায়।’ 

বিখ্যাত ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অ্যাডাম বোরল্যান্ডের ব্যাখ্যাও এক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে। তার মতে, আধুনিক যুগের ক্রীড়া ভক্তরা তাদের প্রিয় দল বা খেলোয়াড়দের সাথে এক ধরনের প্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক গড়ে তোলে। এটি এমন এক একমুখী মনস্তাত্ত্বিক বন্ধন, যেখানে ভক্ত মনে করে গ্যালারি বা টিভির ওপারের খেলোয়াড়টি তার অত্যন্ত আপন কেউ। যখন নেইমারের মতো প্রিয় তারকা খেলোয়াড় মাঠে কাঁদেন, তখন ভক্তের মনে হয় তার নিজের ভাই বা পরম বন্ধুটি ব্যথায় জর্জরিত হচ্ছে। 

একই সাথে ফুটবল খেলা মানুষের সামষ্টিক সামাজিক পরিচয় গঠন করে। চায়ের দোকানে বা স্টেডিয়ামে যখন শত শত মানুষ একসাথে বসে খেলা দেখে, তখন তাদের সামাজিক একাকিত্ব দূর হয় এবং আত্মসম্মানবোধ একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আবদ্ধ হয়। যখন সেই বৃত্তটি ভেঙে যায়, যখন দল হেরে যায়, তখন ব্যক্তির অহং (ইগো) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভক্তের মনে হয়, তার নিজের অস্তিত্বটাই যেন সমাজের সামনে ছোট হয়ে গেল। এই তীব্র সামাজিক ও স্নায়বিক অপমানের মিশ্রণই শেষ পর্যন্ত মানুষের চোখের বাঁধ ভেঙে দেয়। তাই প্রিয় দলের হারে যখন কোনো ভক্ত ফুঁপিয়ে কাঁদে, তখন তাকে উপহাস করা অনুচিত হবে। কারণ সেটি তার মস্তিষ্কের এক আদিম, অবাধ্য ও অত্যন্ত বাস্তব যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ।


শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা