ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩০ এএম
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জের বাসিন্দা শাহাদৎ হোসেন। সম্প্রতি তিনি একটি ছোট প্লট কিনেছেন। রেজিস্ট্রেশন অফিসে এর দলিল করতে গিয়ে বিচিত্র সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। টাকা-পয়সাও খরচ হয়েছে বিস্তর। আবার ভূমি অফিসে নামজারি করতে গিয়েও নানা প্রতিবন্ধকতায় পড়তে হয়েছে। তিনি দেখেছেন, কোথায় কী করতে হবে, তা সুস্পষ্ট নয়। শুধু গাজীপুর নয়, বিভিন্ন জেলায় তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, জমির দলিল রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি ছাড়াও ‘অলিখিত খরচ’ দিতে হয়। দলিলের ধরন, জমির অবস্থান ও মূল্যভেদে এই অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ ভিন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি মোট খরচের উল্লেখযোগ্য অংশ।
একজন শাহাদৎ হোসেনের উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে জমি-সংক্রান্ত সেবা নাগরিক জীবনের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। একটি দলিল রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে নামজারি, খাজনা পরিশোধ কিংবা রেকর্ড সংশোধনÑ প্রতিটি ধাপেই সাধারণ মানুষকে যেতে হয় একাধিক দপ্তরে। প্রশাসনিক কাঠামোর এই বিভাজন দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকদের ভোগাচ্ছে। বিশেষ করে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তর এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীন মাঠপর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টনের অসামঞ্জস্য নিয়ে আবার নতুন করে আলোচনা হচ্ছে।
দ্বৈত ব্যবস্থার উৎপত্তি
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক এবং ভূমি মন্ত্রণালয় একসময় একসঙ্গে ছিল। এরই মধ্যে ১৯৭৩ সালে সরকার নিবন্ধন অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৭৫ সাল ও ১৯৮২ সালের প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে তাকালে দেখা যায়, বিভিন্ন সময় আইন ও ভূমি বিভাগ একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও পরে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পৃথক করা হয়। নিবন্ধন অধিদপ্তরের উদ্দেশ্য ছিল, দলিল রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করা। অপরদিকে জমির মালিকানা, রেকর্ড, খাজনা আদায় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা রাখা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে। শুরুতে এই বিভাজন কার্যকর মনে হলেও ক্রমশ দুই দপ্তরের কাজের মধ্যে সমন্বয়হীনতা বাড়তে থাকে। একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহলের ইচ্ছায় রেজিস্ট্রেশনের কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে না রেখে পৃথকভাবে নিবন্ধন অধিদপ্তরে রাখা হয়।
সেই থেকে এখনও জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে একজন নাগরিককে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন অফিসে দলিল নিবন্ধন করতে হয়। তারপর ভূমি অফিসে গিয়ে নামজারি বা খারিজ করতে হয়। আবার খাজনা পরিশোধ, রেকর্ড সংশোধন কিংবা মিউটেশনÑ সবই আলাদা প্রক্রিয়া। এই বিচ্ছিন্ন কাঠামোই জটিলতার মূল উৎস বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায়ে দ্বৈততা
জমি সংক্রান্ত রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও দ্বৈততা স্পষ্ট। জেলা প্রশাসনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) রাজস্ব আদায়ের ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেন। অন্যদিকে রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলো দলিল নিবন্ধনের সময় স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি আদায় করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘একই খাত থেকে রাজস্ব আসছে, কিন্তু দুই মন্ত্রণালয়ের আলাদা নিয়ন্ত্রণ। এতে সমন্বয়হীনতা দেখা দেয়, আবার জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়ে। ওদিকে মাঠ প্রশাসনে আবার ভূমি অফিসের কর্মরতরাই জমির সকল কাজ করে থাকেন।’
সংস্কারের উদ্যোগ ও বাধা
ভোগান্তি কমাতে বিভিন্ন সময়ে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার প্রস্তাব উঠেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা চালুর পর এই দাবি আরও জোরালো হয়। বলা হয়, জমির মালিকানা, রেকর্ড ও ব্যবস্থাপনা যখন এক মন্ত্রণালয়ের অধীনে, তখন রেজিস্ট্রেশনও একই ছাতার নিচে থাকলে সেবা সহজ হবে। সর্বশেষ গত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবের পক্ষে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, একটি ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু করা গেলে নাগরিকদের সময় ও খরচ দুটোই কমবে। বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন নীতিনির্ধারক এ প্রস্তাবে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আইন মন্ত্রণালয় এতে আপত্তি তোলে। বৈঠকে ছিলেন আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি এ প্রস্তাবের চরম বিরোধিতা করে একপর্যায়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। বৈঠকে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার যুক্তি ছিল, ‘দলিল রেজিস্ট্রেশন একটি আইনি প্রক্রিয়া। এটি বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই তাদের অধীনেই থাকা উচিত।’
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রেজিস্ট্রেশন মূলত আইনি যাচাই প্রক্রিয়া। তবে এটি প্রশাসনিক সেবার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই একে পুরোপুরি আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখার যুক্তি যেমন আছে, তেমনি এটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করাও জরুরি।’
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান কাঠামোতে নাগরিকদের একাধিক দপ্তরে যেতে হয়, যা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে। যদি সব সেবা এক জায়গায় আনা যায়, তাহলে স্বচ্ছতা বাড়বে। জনগণের উপকারও হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রধান উপদেষ্টার ইচ্ছা থাকার পরও বিরোধিতার কারণে সেটি করা সম্ভব হয়নি। উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এটি অনুমোদনের জন্য চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন আইন উপদেষ্টার অনাগ্রহের কারণে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ফলে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’ সরকার বিষয়টিকে হয়তো ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করে দেখবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।
ডিজিটাল উদ্যোগ ও বাস্তবতা
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে ভূমিসেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। অনলাইনে খাজনা পরিশোধ, ই-মিউটেশন ইত্যাদি চালু হয়েছে। তবে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি। ফলে একটি বড় অংশ এখনও ম্যানুয়াল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্লাটফর্ম তৈরি করা গেলে রেজিস্ট্রেশন ও ভূমিসেবা একত্রিত করা সম্ভব। এতে দুর্নীতি কমবে এবং তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়বে।
অনেক দেশে জমি-সংক্রান্ত সব সেবা একক কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয়। যেমনÑ সিঙ্গাপুরে ল্যান্ড অথরিটি এবং যুক্তরাজ্যে ল্যান্ড রেজিস্ট্রি একই কাঠামোর মধ্যে কাজ করে। বাংলাদেশে এ ধরনের মডেল চালু করতে হলে আইনি কাঠামো পরিবর্তনসহ বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কার প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি হলো দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো। এক্ষেত্রে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ধাপে ধাপে সমাধান বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এ ছাড়া নাগরিক সেবার মান উন্নত করতে হলে দালালচক্র নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত ফি নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের ওপর জোর দিতে হবে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, ‘জমি-সংক্রান্ত সেবা একটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশে এই খাতে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বিভাজন এখন সংস্কারের দাবি উঠেছে। রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম কোন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবেÑ এই বিতর্কের চেয়ে বড় বিষয় হলো, নাগরিক কতটা সহজে ও স্বচ্ছভাবে সেবা পাচ্ছেন। যতদিন পর্যন্ত এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত ভূমিসেবায় ভোগান্তির অবসান হবে না।’ এজন্য নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে এমনটাই মনে করেন তিনি।