গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ভোর ৪টা বেজে ১৪ মিনিট। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাজলা এলাকা প্রায় জনশূন্য। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা কয়েকটি ট্রাকের শব্দ ছাড়া চারপাশে অস্বস্তিকর নীরবতা! নয়াগর গলির মুখে পৌঁছাতেই আচমকা সেই নীরবতা ভাঙে কয়েকজন যুবকের চিৎকারে।
সামনে এগোতেই দেখা যায়, দুটি ফোর-ভি ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল গলির দুই পাশে আড়াআড়ি দাঁড় করিয়ে একজন মোটরসাইকেল আরোহীর পথরোধ করা হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে চার যুবক ঘিরে ফেলে তাকে। একজন ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে ধরেছে তার গলার কাছে, অন্যরা পকেট তল্লাশি করে ছিনিয়ে নেয় তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা। পুরো ঘটনাটি ঘটে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। এরপর দুই মোটরসাইকেলে চড়ে চার যুবক দ্রুত পালিয়ে যায় অন্ধকার গলিপথে। এ প্রতিবেদক বৃহস্পতিবার রাতে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে রাতযাপন শেষে বাসায় ফেরার পথে প্রত্যক্ষ করেন পুরো ঘটনাটি।
ঘটনার পর গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ আতঙ্কিত কণ্ঠে বলেন, এই মাত্র ছিনতাই হলোÑ সামনে যেতে ভয় পাচ্ছি! কী ঘটেছে জানতে চাইলে তিনি জানান, দুটি ফোর-ভি মোটরসাইকেলে চারজন যুবক এসেছিল। তারা দুই দিক থেকে এসে ওই মোটরসাইকেল আরোহীকে আটকে ফেলে। এরপর তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তি ঘটনার পর কোনো ধরনের উচ্চবাচ্য না করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। আতঙ্ক ও হতভম্ব অবস্থায় তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা সোহাগ। তিনি জানান, ছিনতাইকারীদের ব্যবহৃত দুটি মোটরসাইকেলের মধ্যে একটির নম্বর তিনি দেখতে সক্ষম হয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলটির নম্বর ছিল ঢাকা মেট্রো-১১-৬২৭৩।
কিছুক্ষণের মধ্যে আশপাশের আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা আসেন ঘটনাস্থলে। তারা জানান, ছিনতাইকারীরা বাইরের এলাকা থেকে এসে পরিকল্পিতভাবে এই নির্জন গলিটিকে টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করেছে। বোঝা যায়, আগে থেকেই জায়গাটা চিনে তারা।
শুধু ভোর রাত নয়, রাত ১২টা বাজলেই পুরো যাত্রাবাড়ী কার্যত চলে যায় ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণে। অন্ধকার নামার সঙ্গে সঙ্গে ধারালো অস্ত্র হাতে সংঘবদ্ধ চক্র অবস্থান নেয় ফুটওভার ব্রিজ, গলি, বাসস্ট্যান্ড, ফ্লাইওভারের নিচ, আড়ত ও মহাসড়ক-সংলগ্ন বিভিন্ন স্পটে। এরপর শুরু হয় পথরোধ, ছুরির ভয় দেখিয়ে ছিনতাই, প্রতিরোধ করলেই এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। পথচারী, রিকশার যাত্রী, কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী, দূরপাল্লার বাস থেকে নামা যাত্রী কেউই নিরাপদ নন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাতের পর পুরো এলাকা ‘রেড জোন’ (ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ) হয়ে ওঠে। অথচ এই পরিস্থিতিতেও নেই নিয়মিত পুলিশি টহল, নেই দৃশ্যমান অভিযান। সরেজমিন ঘুরে, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, দনিয়ার নাভানার গলি, মাদ্রাসা গলি, দাগু খান গলি, শনির আখড়ার অন্বেষা গলি, ফুটওভার ব্রিজ, সালমান হাসপাতালের সামনের সড়ক, কাজলার চান মিয়া রোড, কুতুবখালী ওয়াসার সামনের এলাকা, পকেট গেট, আড়তের মাঝের রাস্তা ও কুতুবখালীতে প্রবেশের দুটি গলিÑ রাত গভীর হলেই পরিণত হয় ছিনতাইকারীদের নিরাপদ আস্তানায়। স্থানীয়রাও বলছেন, এসব স্পটে রাত ১২টার পর চলাচল মানেই জীবন হাতে নিয়ে চলা। কারণ পুলিশের টহল চোখে না পড়লেও অস্ত্রধারীদের প্রকাশ্য ঘোরাফেরা দেখা যায় হরহামেশা।
যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইয়ের ভয়াবহতার প্রমাণ মিলেছে একের পর এক হামলায়। কাজলা এলাকার এক চায়ের দোকানি জানান, সিলেট থেকে ফিরে রাত ১টার দিকে ফুটওভার ব্রিজ পার হওয়ার সময় ছিনতাইকারীর হামলায় গুরুতর আহত হন তিনি। তার শরীরে ছয় ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছিল। পরে নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছেড়ে চলে যান।
কুতুবখালীতে ভোরে আড়তে যাওয়ার পথে রনি নামের এক সবজি ব্যবসায়ীর ঘাড়ে ছুরির কোপ দিয়ে সব টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কুতুবখালী ডাচ-বাংলা ব্যাংকের বুথসংলগ্ন গলিতে রিকশা থামিয়ে চাপাতি ঠেকিয়ে ছিনতাই করতে দেখলেও কেউ ভয়ে এগিয়ে আসেনি। স্থানীয়দের দাবি, এসব চক্রে স্থানীয়দের পাশাপাশি বহিরাগত অপরাধীরাও যুক্ত।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ছিনতাইয়ের অভিযোগে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২৪ জুন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওয়ারী বিভাগের একটি দল যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা ও সায়েদাবাদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে এদের গ্রেপ্তার করে। এরা হলেনÑ মো. ইসমাইল হারিজ, মো. আলম, মো. রবিন, মো. সিদ্দিকুর রহমান, নাছাত খান নাবিল ও রবিউল ইসলাম মাহিন। পুলিশের দাবি ছিলÑ গ্রেপ্তাররা পেশাদার ছিনতাইকারী।
রাত নয়, দিনের বেলাও এই এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। গত ১৯ মে যাত্রাবাড়ী মোড়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এক নারীর কান থেকে স্বর্ণের দুল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় দুই ছিনতাইকারীকে আটক করে পুলিশ। এ সময় ছিনিয়ে নেওয়া স্বর্ণের দুলও উদ্ধার করা হয়। আটকরা হলেন মো. কামাল ও মো. মাসুদ।
ছিনতাইয়ের ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করলেই পড়তে হয় মৃত্যুর কবলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যাত্রাবাড়ীতে ছিনতাইকারীদের হামলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সায়েদাবাদ ব্রিজের ঢালে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন হাফেজ মো. কামরুল হাসান। ২০২৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি মাতুয়াইল মাদ্রাসা বাজার এলাকায় বাসায় ফেরার পথে নিহত হন কাওসার হাওলাদার। একই বছরে ধলপুর বউবাজার এলাকায় সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে বের হওয়ার পর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান অজ্ঞাত এক যুবক। আর ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ী আড়তের সামনে ব্যবসায়ী আশীষ জোয়াদ্দারকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে আইফোন ও টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। পরে ঢাকা মেডিক্যালে তার মৃত্যু হয়। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে চার লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে বোঝা যায় ছিনতাইকারীরা এখন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারেও দ্বিধা করছে না।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যানও স্থানীয়দের অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়। ২০২৪ সালের শেষ চার মাস ও ২০২৫ সালে ঢাকার সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের মামলা হওয়া থানাগুলোর একটি যাত্রাবাড়ী। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচ, ধলপুর ও মীরহাজিরবাগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। অপরাধ বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে শনির আখড়া ফুটওভার ব্রিজ, রায়েরবাগ, কুতুবখালী, দনিয়া, কাজলা, দাগু খান গলি ও সালমান হাসপাতাল-সংলগ্ন সড়কের নাম। তবে স্থানীয়দের দাবি, অধিকাংশ ভুক্তভোগী মামলা করেন না। ফলে প্রকৃত ছিনতাইয়ের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।
ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মল্লিক আহসান উদ্দিন সামী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “ওসিকে টহল জোরদারের নির্দেশ দেব।”
ওয়ারী জোন পুলিশের দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ডেমরা এক্সপ্রেসওয়ের অংশ, যানজট, ভোরে দূরপাল্লার যাত্রী নামা ও ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণ কঠিন। চলতি বছরের মে মাসে ১৩৮ জন ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জামিনে বেরিয়ে অনেকেই আবার ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে। কুতুবখালীর পকেট গেট খোলা থাকাও অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে দাবি পুলিশের।
স্থানীয়রা বলছেন, যেসব স্পটে প্রতিরাতে একই কায়দায় ছিনতাই হয়, যেখানে মানুষ নিয়মিত রক্তাক্ত হচ্ছে, এমনকি প্রাণ হারাচ্ছে, সেখানে পুলিশের টহল কিংবা অভিযান কিছুই দেখা যায় না। নিয়মিত মোবাইল টহল, সিসিটিভি মনিটরিং ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানের দাবি জানিয়েছেন তারা।