× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

এক্সিট সুবিধা: এককালীন ঋণ পরিশোধে কেন জোর বিবির

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ব্যাংক। ফাইল ছবি

দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে পুষে রাখা ক্ষত ‘খেলাপি ঋণ’ এখন বিষফোড়া হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ব্যাংকগুলোর সার্বিক আর্থিক স্বাস্থ্যকে চরমভাবে দুর্বল করে তুলেছে।

ফলে সম্পদের গুণগত মান হ্রাস, তীব্র তারল্য সংকট এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বহুমুখী সংকটে জর্জরিত দেশের আর্থিক খাত।

এই তীব্র সংকটজনক প্রেক্ষাপটে ব্যাংক খাতের তারল্য প্রবাহ সচল করতে এবং মন্দ বা ক্ষতিজনক মানের ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ ‘এক্সিট সুবিধা’ বা এককালীন ঋণ পরিশোধের নীতি ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে গত সোমবার এ সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।

এই নতুন নির্দেশনাটি এমন এক সময়ে এলো যখন ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ছুঁয়েছে। মূলত যেসব ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ কারণে সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা এবং ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা রয়েছেÑ তাদের একটি সম্মানজনক ও সহজ বিদায় (এক্সিট) দেওয়ার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বহাল থাকা এই সুবিধা ব্যাংক খাতের জন্য কতটা টেকসই সমাধান আনবে, তা নিয়ে এখন নীতি নির্ধারণী মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

বিষয়টি কী?

সহজ ভাষায়, ‘বিশেষ এক্সিট সুবিধা’ হলো কোনো ঋণগ্রহীতা যদি তার ব্যাংকের পাওনা টাকা আর নিয়মিত চালাতে না পারেন এবং তার ঋণটি যদি ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ বা চূড়ান্ত খেলাপি ক্যাটাগরিতে চলে যায়, তবে তাকে একটি বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে এককালীন পুরো টাকা শোধ করে ব্যাংক থেকে মুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

এই সুবিধার আওতায় গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে তার ওপর অর্পিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফ বা ছাড় পেতে পারেন। তবে প্রধান শর্ত হলো, ছাড় দেওয়ার পর অবশিষ্ট সম্পূর্ণ টাকা এককালীন নগদ পরিশোধ করতে হবে। এটি কোনো সাধারণ ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ নয়, বরং ঋণের হিসাবটি সম্পূর্ণ বন্ধ বা ‘ক্লোজ’ করে দেওয়ার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া।

পটভূমি 

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি রাতারাতি তৈরি হয়নি। গত দেড় দশকে বিভিন্ন সময়ে ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ নীতিমালা শিথিল করা, বিশেষ ওয়ান-টাইম এক্সিট সুবিধা দেওয়া এবং বারবার সময় বাড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০১৯ ও ২০২২ সালেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ডাউনপেমেন্টে পুনঃতফসিল ও এক্সিট সুবিধা দিয়েছিল।

আইনি ও নীতিগতভাবে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ধরনের নির্দেশনা জারি করে থাকে। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বড় পরিবর্তনের পর ব্যবসায়ীরা প্রায়শই ঋণ পরিশোধে শিথিলতার দাবি জানান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনেক ব্যবসায়ী নতুন করে সংকটে পড়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ জুন ২০২৬-কে ভিত্তি তারিখ ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন বিশেষ এক্সিট সুবিধাটি চালু করেছে, যাতে ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে পুনঃতফসিল করা ঋণও এর আওতায় আসতে পারে।

সার্কুলার অনুযায়ী ৩০ জুন ২০২৬ তারিখের ভিত্তিতে যেসব ঋণ ‘মন্দ ও ক্ষতিজনক’ মানে শ্রেণিকৃত হয়েছে, কেবল সেগুলোই এই সুবিধার আওতাভুক্ত হবে। গ্রাহকরা এই সুবিধা গ্রহণের জন্য আবেদন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত।

বিদ্যমান কঠোর নীতিমালার কারণে ব্যাংকগুলো চাইলেই ঢালাওভাবে সুদ মওকুফ করতে পারে না। কিন্তু এই বিশেষ সার্কুলারে আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের শর্ত বেশ শিথিল করা হয়েছে, যাতে ব্যাংক ও গ্রাহক উভয় পক্ষই দ্রুত একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে। 

কুটিরশিল্প, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (সিএমএসএমই) এবং স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণকে এই নির্দেশনায় বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। বড় খেলাপিদের পাশাপাশি যেন প্রকৃত সংকটে পড়া ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা এর সুফল পান, তা নিশ্চিত করাই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

তবে এই সুবিধা দেওয়ার আগে ঋণগ্রহীতার সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো ঋণ এই সুবিধার আওতায় আনা যাবে না।

সম্ভাব্য সুফল

ব্যাংকের যে টাকা সম্পূর্ণ ‘ডুবন্ত’ বা মন্দ ঋণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল, এই সুবিধার মাধ্যমে তার একটি বড় অংশ এককালীন নগদ টাকা হিসেবে ব্যাংকে ফেরত আসবে। নগদ টাকা ব্যাংকে ফেরত আসার ফলে ব্যাংকগুলোর বর্তমান তীব্র তারল্য সংকট কিছুটা কমবে। খেলাপি ঋণ কমলে ব্যাংকগুলোকে সেই ঋণের বিপরীতে কম প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয়। এতে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা বা লেন্ডিং ক্যাপাসিটি বাড়ে এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি নন, বরং পরিস্থিতির শিকার হয়ে ব্যবসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, তারা দায়মুক্ত হয়ে নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার আইনি সুযোগ পাবেন। এতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি

বারবার এই ধরনের বিশেষ ছাড় দেওয়ার ফলে নিয়মিত ও ভালো ঋণগ্রহীতারা নিরুৎসাহিত হন। তারা ভাবতে পারেনÑ টাকা শোধ না করে খেলাপি হলে যদি সুদ মওকুফ পাওয়া যায়, তবে কষ্ট করে সময়মতো ঋণ শোধ করার দরকার কী, যা ব্যাংক খাতে একটি নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে।

নির্দেশনায় ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্ক ও পরিশোধের সক্ষমতা যাচাইয়ের কথা বলা হলেও, সুশাসনের অভাবে অনেক সময় প্রভাবশালী ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা এই সুবিধার অপব্যবহার করে পার পেয়ে যেতে পারেন। বড় অঙ্কের সুদ মওকুফ করার কারণে কাগজে-কলমে ব্যাংকগুলোর অর্জিত আয় বা মুনাফায় সাময়িকভাবে বড় আঘাত আসতে পারে। ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট বা আর্থিক বিবরণী থেকে মন্দ ঋণের বোঝা কমবে। বিশেষ করে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি, তারা নগদ টাকা আদায়ের একটি বড় সুযোগ পাবে।

এই নির্দেশনায় অগ্রাধিকার পাওয়ায় ছোট উদ্যোক্তারা, যারা আইনি জটিলতা বা ব্যাংক মামলা এড়াতে চান, তারা দ্রুত ব্যাংক থেকে ছাড় পেয়ে সিআইবি মুক্ত হতে পারবেন। সবচেয়ে বড় শিল্প গ্রুপগুলো, যারা সাময়িক নগদ প্রবাহের (ক্যাশ ফ্লো) সংকটে ভুগছে, তারা তাদের অচল হয়ে পড়া সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ঋণ এককালীন মিটিয়ে দিয়ে মূল ব্যবসা সচল রাখতে পারবে।

তবে অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংকিং খাত বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ‘এক্সিট পলিসি’ বা বিদায় নীতি সাময়িকভাবে ব্যাংকের ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করতে সাহায্য করলেও তা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়। বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পর্যবেক্ষণ হলো, যদি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ওপর রাজনৈতিক বা বহিরাগত প্রভাব বজায় থাকে, তবে এই সুবিধার মাধ্যমে প্রকৃত সংকটে পড়া ব্যবসায়ীদের চেয়ে প্রভাবশালীরাই বেশি লাভবান হন।

তাদের মতে, অতীতেও এমন সুবিধা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকানো যায়নি। তাই এই নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিটি ব্যাংকের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (সিআরএম) বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই করতে দিতে হবে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়

কোনো গ্রাহককে এক্সিট সুবিধা দেওয়ার আগে তার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা কোনো স্বাধীন থার্ড-পার্টি অডিটর দ্বারা যাচাই করা উচিত, যাতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা কোনোভাবেই এই সুযোগ না পান। যারা এই সুবিধার সময়সীমার (৩১ ডিসেম্বর ২০২৬) মধ্যেও ঋণ শোধ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনের অধীনে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন করে যেন কোনো খারাপ ঋণ সৃষ্টি না হয়, সেজন্য ঋণ মঞ্জুরির শুরুতেই কঠোর ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হবে এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ এক্সিট সুবিধা সংক্রান্ত নতুন সার্কুলারটি দেশের ঝিমিয়ে পড়া ব্যাংক খাতে গতি ফেরানোর একটি তাৎক্ষণিক ও বাস্তবসম্মত প্রয়াস। মন্দ ঋণ বছরের পর বছর আটকে রেখে ব্যাংকের আর্থিক সূচকগুলো দুর্বল রাখার চেয়ে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও নগদ টাকা তুলে আনা একটি গ্রহণযোগ্য কৌশল।

তবে মনে রাখতে হবে, এটি একটি সাময়িক উপশম বা ‘পেইন কিলার’-এর মতো, মূল রোগের স্থায়ী চিকিৎসা নয়। ব্যাংক খাতের মূল রোগ হলো সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দুর্বল আইনি কাঠামো।

এই বিশেষ সুবিধার পাশাপাশি যদি ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক সংস্কার, জবাবদিহিতা এবং ঋণ মূল্যায়নে কঠোরতা নিশ্চিত করা না যায়, তবে ২০২৬ সালের পর নতুন করে আবারও খেলাপি ঋণের পাহাড় জমার ঝুঁকি থেকেই যাবে। একটি টেকসই ও শক্তিশালী আর্থিক খাত গঠনে তাই ছাড় দেওয়ার নীতির চেয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার নীতিই বেশি জরুরি।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা