বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। ছবি: রয়টার্স
সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এখনও গঠন করা হয়নি।
অথচ জাতীয় সংসদের সংসদীয় কমিটি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলো ওয়াচডগ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে; সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও জবাবদিহিতার জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, সিদ্ধান্ত ও সুপারিশমালা প্রণয়ন করে থাকে। কিন্তু নতুন সরকারের বয়স চার মাস পেরিয়ে গেলেও সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে শম্ভুক গতি দেখা দিয়েছে।
সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী যেকোনো সংসদ গঠিত হওয়ার পর প্রথম তিন অধিবেশনের মধ্যেই সবগুলো কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনও শেষ হওয়ার পথে। আগামী ৯ জুলাই সংসদের চলতি অধিবেশন সমাপ্ত হবে। অথচ ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে এ পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে মাত্র ৮টি সংসদীয় কমিটি এবং ৩টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বিএনপি জোট। ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর সংসদীয় কমিটিগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে এর সভাপতি পদে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। আগে সংসদীয় কমিটির সভাপতি থাকতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। ফলে কমিটির পক্ষে মন্ত্রণালয়ের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন ছিল। তাই কার্যপ্রণালী বিধি সংশোধন করে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয় সংসদ সদস্যদের মধ্যে থেকে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সংসদ সদস্য হলে তিনি এ কমিটির সদস্য হন। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীরা বিশেষ আমন্ত্রণে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়ে থাকেন।
সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে। মন্ত্রণালয়ের অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পেরেছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব চার দলীয় জোট অষ্টম জাতীয় সংসদে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সেবার সংসদীয় কমিটি গঠনে এক বছরেরও বেশি দেরি হয়। এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির বিপুল বিজয়ের পর সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও দেরি হচ্ছে।
গত নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সংসদীয় কমিটিগুলো গঠিত হয়। তখন দলের সিনিয়র নেতাদের সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে যে ১০টি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে ৩টি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এই কমিটির সভাপতিদের মধ্যে জোটের শরিক দল বিজেপির শীর্ষ নেতা আন্দালিভ রহমান পার্থকে আইন-বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির, বিএনপির অন্যতম শীর্ষনেতা স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এবং বর্তমান সংসদের প্রধান বয়োজ্যেষ্ঠ ৯০ বছর বয়স্ক মো. মুশফিকুর রহমানকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
সভাপতি হতে রাজি নন অনেকেই : বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির শীর্ষ নেতা ও সিনিয়র সংসদ সদস্যদের অনেকেই সরকারি কোনও দায়িত্ব পাননি। তাদের সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হতে পারে। এ নিয়ে সিনিয়র সংসদ সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। অনেক সংসদ সদস্যই সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সংসদীয় কমিটির সভাপতি হতে রাজি নন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রতি পরিবারে একজনের বেশি কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না, এমন কথা শুনে আমি নির্বাচনেই অংশ নিতে চাইনি। আমি ছাড়াও আমার পূত্রবধু নিপুন রায় সংসদ সদস্য। আমার বেয়াই সরকারের পূর্ণ মন্ত্রী। সংসদ সদস্য হিসেবে আমি আমার অবস্থানকে মেনে নিয়েছি। জাতীয় সংসদের সদস্যদের জন্য বরাদ্দ করা ফ্ল্যাটের বরাদ্দ নিয়েছিÑ এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই আমার। সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হলে নেবো নাÑ সেটা জানিয়ে দিয়েছি।’
কমিটি গঠনে দেরি সম্পর্কে চিফ হুইপ
সংসদীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব সম্পর্কে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘প্রথম অধিবেশনে কমিটি গঠন করা হয়নি, কারণ নারী আসনের সদস্যরা তখনও নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসেননি। এবার বাজেট অধিবেশন চলছে। একটি বড়ো বিরোধী দল ছাড়াও অনেকগুলো রাজনৈতিক দল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আনুপাতিকহারে তাদেরও স্থান দিতে হবে। এ নিয়ে কাজ চলছে। সংসদ নেতার নির্দেশনা নিয়ে কমিটিগুলো গঠন করা হবে। কমিটি গঠনের একটি টাইম ফ্রেম রয়েছে। আমরা সেটা অতিক্রম করতে চাই না।’
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে থাকে। যতো দ্রুত কমিটি গঠন করা যাবে, সরকারের কাজে ততোই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে। সরকারি দলের উচিত দ্রুত সংসদীয় কমিটিগুলো গঠন করা।’
এদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় প্র্যাকটিসে সংসদীয় কমিটিগুলো এখনো কোণঠাসা। সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে অনেক মন্ত্রণালয়ই সংসদীয় কমিটির সুপারিশ ফাইলবন্দি করে রাখে। অনেক কমিটির সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসে। আবার কোনও কোনও কমিটির বৈঠকে মন্ত্রী ইচ্ছে করেই অনুপস্থিত থাকেন। কোরামের অভাবে কমিটির বৈঠক হয়নি, এমন রেকর্ডও আছে।