জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একাধিক প্রশাসনিক পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) একাধিক প্রশাসনিক পদায়ন ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সরকারি চাকরি বিধি ও সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি অনুসরণ না করে কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছেÑ এমন অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তা ও অভ্যন্তরীণ সূত্র।
তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিএমইটির পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা), উপ-পরিচালক এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুসরণ করা হয়নি। এর ফলে একই ব্যক্তির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন, পদোন্নতির স্বাভাবিক ধারা ব্যাহত হওয়া এবং প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) পদ নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রথমে আইএমটির অধ্যক্ষ (চতুর্থ গ্রেড) হিসেবে পদোন্নতি ও পদায়ন পান। পরে তিনি বিএমইটির প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, আইএমটির অধ্যক্ষ এবং পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) দুটি পৃথক নিয়োগবিধির আওতাভুক্ত পদ। তাই এক পদ থেকে অন্য পদে দায়িত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা উচিত ছিল। তাদের দাবি, এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
তাদের আরও অভিযোগ, এর ফলে আইএমটির অধ্যক্ষ পদ দীর্ঘদিন কার্যত শূন্য অবস্থায় রয়েছে এবং পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) পদেও নিয়মিত পদোন্নতির সুযোগ ব্যাহত হয়েছে।
২০১৭ সালের প্রকল্প পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৭ সালে উপজেলা পর্যায়ে ৪০টি টিটিসি স্থাপন প্রকল্পে উপ-প্রকল্প পরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিধি অনুসরণ করা হয়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, সপ্তম গ্রেডের ওই প্রকল্প পদে সে সময় চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা প্রশাসনিকভাবে অস্বাভাবিক ছিল।
একই পদ ঘিরে দৌড়ঝাঁপ
পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) পদটি ঘিরে নতুন করে তদবির চলছে। অভিযোগ উঠেছে, আইএমটির অধ্যক্ষ মো. সিরাজুল ইসলাম ওই পদে দায়িত্ব পেতে বিভিন্ন পর্যায়ে চেষ্টা করছেন।
এমনকি প্রভাব খাটানো ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও তোলা হয়েছে।
২০২৫ সালের উপ-পরিচালক পদায়ন নিয়ে বিতর্ক
অভিযোগের আরেকটি অংশ ২০২৫ সালের কয়েকটি পদায়নকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন মহাপরিচালকের অনুমোদন এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. আশরাফ হোসেনের স্বাক্ষরে কয়েকজন অধ্যক্ষ ও সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টরকে উপ-পরিচালক হিসেবে প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মূল পদ ছিল অধ্যক্ষ (টিটিসি), অধ্যক্ষ (আইএমটি) ও সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর (আইএমটি)। বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুসরণ না করেই তাদের উপ-পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিধিবহির্ভূত পদ পরিবর্তন বা পদায়নের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে এবং সেগুলো দুর্নীতি দমন কমিশনে অনুসন্ধানাধীন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছেন।
যোগাযোগ করা হলে বিএমইটির অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশিক্ষণ) মো. আশরাফ হোসেন বলেন, বিধি অনুসরণ করেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদায়ন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। তাদের মতে, কোনো কর্মকর্তা বৈধভাবে দায়িত্ব পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি প্রকাশের মাধ্যমে বিতর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব। অন্যদিকে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বিএমইটি প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সুশাসন নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করা প্রয়োজন।