নারীদের সঙ্গে নকশিকাঁথা বুনছেন উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ধূলজুরী গ্রামের নিভৃত জনপদে নীরবে ঘটছে এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের গল্প।
যেখানে একসময় নারীদের জীবন সীমাবদ্ধ ছিল ঘর-সংসার আর আর্থিক নির্ভরশীলতার গণ্ডিতে, সেখানে আজ তারা হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তা, আয় করছেন নিজের হাতে, নিচ্ছেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন নারী উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতি।
নিশ্চিত ভবিষ্যৎ, সামাজিক মর্যাদা ও স্থিতিশীল জীবনের প্রতীক সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন সংগ্রামের পথ। তার বিশ্বাস ছিল- গ্রামের নারীদের দক্ষতা ও শ্রমকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা গেলে বদলে যেতে পারে অসংখ্য পরিবারের ভাগ্য। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় তার পথচলা।
স্বপ্ন থেকে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা
২০২৪ সালে নিজস্ব অর্থায়নে মাত্র ১০ জন নারীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করে 'নকশীকাঁথা মহিলা উন্নয়ন সংস্থা'। শুরুটা ছিল ছোট্ট একটি কক্ষে, হাতে গোনা কয়েকজন নারী আর কিছু সুঁই-সুতার মাধ্যমে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে য়েছে একটি একটি বিস্তৃত নারী উন্নয়ন প্লাটফর্মে। বর্তমানে প্রায় ১৪০ জন নারী সরাসরি যুক্ত রয়েছেন এই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রমে। শুধু নকশিকাঁথা নয়, প্রতিষ্ঠানটির আওতায় গড়ে উঠেছে- উদ্যমী মহিলা সমবায় সমিতি লিমিটেড, পাট হস্তশিল্প, মাশরুম চাষ এবং মৎস্য খামারভিত্তিক কর্মসংস্থান কার্যক্রম। ফলে নারীদের জন্য তৈরি হয়েছে বহুমুখী আয়ের সুযোগ।
গ্রামে গড়ে উঠছে নীরব শিল্পবিপ্লব
ধূলজুরী কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকায় গেলে চোখে পড়ে এক ভিন্ন দৃশ্য। গ্রামের বাড়িগুলো যেন ছোট ছোট উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
কোথাও নারীরা ব্যস্ত নকশিকাঁথার সূক্ষ্ম নকশা ফুটিয়ে তুলতে, কোথাও পাটের তৈরি ব্যাগ, ঝুড়ি ও শোপিস তৈরিতে। আবার কেউ মাশরুম উৎপাদন কিংবা মাছ চাষের মাধ্যমে আয় করছেন।
বদলে যাচ্ছে নারীদের জীবন
উদ্যোগটির সঙ্গে যুক্ত নারী কর্মী মাহমুদা আক্তার বলেন, “আগে সংসারের কাজের বাইরে আমার কোনো পরিচয় ছিল না। এখন নিজের আয় আছে, পরিবারের খরচে সহযোগিতা করতে পারছি। এতে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়েছে।”
ফারিয়া জাহান বলেন, “এই উদ্যোগ আমাদের শুধু আয় দেয়নি, দিয়েছে আত্মমর্যাদা। এখন পরিবারেও আমাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।”
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্থায়ী কার্যালয়
সাফল্যের গল্পের মাঝেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। সামিয়া নাছরিন প্রীতি জানান, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো একটি স্থায়ী অফিসের অভাব। নিজের বাসার ছোট একটি কক্ষকে অফিস হিসেবে ব্যবহার করতে হচ্ছে। উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও প্রশিক্ষণ ও বৈঠকের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই।
তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত নিজের অর্থায়নেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেছি। অনেক নারী উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করেছি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে এগিয়ে নেওয়া কঠিন।”
তিনি আরও জানান, বর্তমানে ইউনিসেফের সহযোগিতায় শিশুদের জন্য কিছু শিক্ষা ও খেলাধুলার উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের সন্তানদের জন্য আলাদা টয় কর্নার বা নিরাপদ খেলার জায়গা না থাকায় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
পাশে আছে পরিবার
প্রীতির স্বামী রুবায়েদ হোসেন রায়হান সাকিব বলেন, “নারীদের স্বাবলম্বী করার কাজে আমার স্ত্রী যে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, তা আমাদের পরিবারের জন্য গর্বের বিষয়। বর্তমানে প্রায় ৩০ জন মৎস্য চাষে, ৩০ জন মাশরুম উৎপাদনে এবং শতাধিক নারী নকশীকাঁথা তৈরির কাজে যুক্ত আছেন।”
তিনি জানান, শুধু কর্মসংস্থান নয়, পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চলতি বর্ষায় প্রায় ৫০০টি গাছও বিতরণ করা হয়েছে।
প্রশাসনের ইতিবাচক আশ্বাস
হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “উদ্যোক্তা সামিয়া নাছরিন প্রীতির একটি স্থায়ী কার্যালয়ের প্রয়োজন রয়েছে। বিষয়টি প্রশাসনের বিবেচনায় আছে। ভবিষ্যতে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে পরিকল্পনা করা হবে।”