আহমেদ তোফায়েল
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতকে ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখার প্রধান হাতিয়ার ক্ষুদ্র শিল্প বা এসএমই। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও এই খাতের ভূমিকা বেশি। অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে সংক্ষেপে এমএসএমই বলা হয়।
বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে এই খাতের অবদান অনেক। এই অবদানকে স্বীকৃতি দিতে প্রতি বছরের মতোই গত ২৭ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হলো এসএমই দিবস।
২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে এই দিবসটি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এটি গুরুত্বের সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতকে ‘লাইফলাইন’ বলা হয়। এটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই খাত নানা সমস্যায় জর্জরিত। প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থায়নের অভাব ও উচ্চ সুদহার। এ ছাড়া প্রযুক্তিগত অনগ্রসরতা এবং বাজারজাতকরণের সংকট তো রয়েছেই। এই কারণে খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ থমকে আছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে মোট ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অবদান রাখছে এই খাত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এর সরাসরি অবদান প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। বিশ্বজুড়ে কর্মক্ষম দরিদ্র, নারী ও তরুণদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এটি কাজ করছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এই খাতটি মেরুদণ্ড হিসেবে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে এটি সাহায্য করেছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখতে এসএমই খাত ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে ‘অর্থনীতির মেরুদণ্ড’ বলা হয়। দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ থেকে ১ কোটি ১৮ লাখের মতো কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সংখ্যা সামগ্রিক শিল্প ইউনিটের প্রায় ৯৯ শতাংশ। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। দেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই সৃষ্টি হচ্ছে এখান থেকে। শিল্প খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ এই খাতের দখলে। সামগ্রিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই হার ৪০ শতাংশ। এই খাতে বর্তমানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ কর্মরত আছেন। উৎপাদনমুখী খাতে এর মূল্য সংযোজনের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এসএমই খাতের বিকল্প নেই। এটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের একটি বড় লক্ষ্য রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে এসএমই ফাউন্ডেশন। এটি তৃণমূলের উদ্যোক্তাদের বিকশিত করতে সাহায্য করে। ২০০৬ সালে এই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংস্থাটি এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ হাজার উদ্যোক্তাকে ঋণ দিয়েছে। এর পরিমাণ ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বেশি। এই কর্মসূচির সুবিধাভোগী প্রায় ২২ লাখ উদ্যোক্তা। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশই নারী।
মাঠপর্যায়ের সংকট ও প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোটি কোটি টাকার তহবিল ঘোষণা করেছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র এখনও মসৃণ নয়। দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রথম সংকট হলো ঋণপ্রাপ্তির জটিলতা ও ব্যাংকের অনীহা। গবেষনায় দেখা গেছে, দেশের ক্ষুদ্র উদ্দ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে রয়েছে। এই খাতের প্রায় ৬০ শতাংশ উদ্যোক্তাই প্রথাগত ব্যাংকঋণ পান না। জামানতবিহীন ঋণের কথা বলা হলেও ব্যাংকগুলো নানাবিধ নমিপত্র খোঁজে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রেড লাইসেন্স, অ্যাট রেজিস্ট্রেশন ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট। তারা শক্তিশালী গ্যারান্টরের ঘোঁজও করে। এসব শর্ত পূরণ করতে না পেরে আনেক অতিক্ষুদ্র উদ্যোক্রন বিপাকে পড়েন। তারা বাধ্য হয়ে চড়া সুদে এনজিও বা অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে ঋন নেন।
দ্বিতীয় সংকট হলো কাঁচামালের চড়া মূলা ও নীতি সহায়তার অভাব। দেশে বর্তমানে জ্বালানি সংকট ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি চলছে। বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে কাঁচামালের আমদানি খরচ বহুগুণ বেড়েছে। বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধাক্কা সামলাতে পারে। কিন্তু ক্ষুদ্র মূলধনের ব্যবসায়ীরা উৎপাদন খরচ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে বাজারে তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা
তৃতীয় সংকট হলো প্রযুক্তির ব্যবহারে অনগ্রসরতা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে ই কমার্স ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ এসএমই এখনও সনাতন পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। আইটি জ্ঞান ও ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসির অভাব রয়েছে। এই কারণে তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সুযোগ নিতে পারছে না। এর বাইরে বাজারজাতকরণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের কুটির শিল্পের কারিগররা পণ্যের সঠিক মূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। এটি উদ্যোত্তনদের লভ্যাংশ কমিয়ে দেয়।
চার বছরের সর্বনিম্ন অবস্থানে এসএমই ঋণ
উদ্যোক্তাদের এই সংকটের প্রতিফলন ঘটেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোর এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ চার বছরের মধ্যে সর্বনিয়া অবস্থানে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এই পরিমাদ আগের অর্থবছরের তুলনায় ৯ শতাংশ কম।
সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যাংকাররা এই বিষয়ে জানিয়েছেন, অনিশ্চয়তার সময়ে ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগ করতে চান না। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা সম্প্রসারণের চেয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ের ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
কাগজে-কলমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নানা সুবিধার কথা বলা হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কতটা কঠিন, তা রাবেয়া সুলতানার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়। তিনি ঢাকার মিরপুরের জামদানি ও বুটিক পণ্য প্রস্তুতকারক এক ক্ষুদ্র উদ্যোয়ন। পাঁচ বছর আগে মাত্র ৫০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ঘরে বসে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে তার অধীনে ১০ জন গ্রামীণ নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বাবসা বড় করার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রাবেয়া বলেন, “অনলাইনে আমার পণ্যের চাহিদা বাড়ায় ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিই। গত বছর একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ১০ লাখ টাকা ঋণের জন্য আবেদন করেছিলাম। সরকারি নিয়মে জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংক মেকে আমাকে কোনো সরকারি চাকরিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত বাবসায়ী জামানতকারী ছাড়া ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়। একজন নারী উদ্যোক্তণ হিসেবে আমার পক্ষে ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে চড়া সুদে পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে।”
রাবেয়ার এই অভিজ্ঞতা দেশের হাজারো সম্ভাবনাময় ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তার বাস্তব প্রতিচ্ছবি। পুঁজির আভাবে তারা নিজেদের বাবসাকে বড় করতে পারছেন না।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) খাতের সুরক্ষায় বিশেষ ঋণ সুবিধা ও কর অব্যাহতি দিতে হবে। করেনা মহামারি এবং বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ এই খাতটি আমাদের মোট জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখে এবং শিরদ খাতের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮০ শতাংশ সুযোগ সৃষ্টি করে। এসএমই খাতের টেকসই উন্নয়নে অল্প সুদে ঋণ সুবিধা প্রবর্তন, ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিতকরণ ও এর প্রক্রিয়া সহজীকরণের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা এবং কর অব্যাহতির উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
নতুন সরকারের উদ্যোগ
তবে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা প্যাকেজ মোষনা করেছে। বিশেষ করে জাতীয় বাজেটে সিএমএসএমই খাতের জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন সংকট দূর করতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ২ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন ঋণ তহবিল ঘোষণা করেছেন।
সরকার শিল্প, সেবা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আধুনিক কৃষিভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এই তহবিলটি সরকারের তিনটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো-এসএমই ফাউন্ডেশন, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল) এবং বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল)। পরবর্তীতে এই প্রক্রিয়ায় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনসহ (পিকেএসএফ) আরও দুয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হতে পারে। গ্রাহক পর্যায়ে এই ঋনের সর্বোচ্চ সুদের হার ৫ শতাংশের মধ্যে বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ৫ বছরে এই খাতের ৩০ হাজার নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে শিল্প মন্ত্রণালয় আগামী দুই অর্থবছরের জন্য মোট ৩ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋল তহবিল চেয়েছিল। এর প্রথম কিস্তি হিসেবে এই ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলো। ইতঃপূর্বে ২০২১ সালে করোনা মহামারির ধাক্কা কাটাতে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা পেয়েছিল এসএমই ফাউন্ডেশন। ৪ শতাংশ সুদে বিতরণ করা সেই ঋণের টাকা ফেরত আসার পর একটি ঘূর্ণমান তহবিল গঠন করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোত্তনদের ব্যবসায়িক গতিশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্প্রতি আরও ৪৫ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে এসএমই ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের রিভলভিং তহবিল থেকে ক্রেডিট হোলসেলিং কর্মসূচির আওতায় এই ঋণ বিতরণ করা হবে। এ লক্ষ্যে দেশের ৩টি ব্যাংক-মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বর্তমানে ফাউন্ডেশনের নিজয় আবর্তনশীল তহবিল থেকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৪৪০ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এই ঋণের আওতায় অগ্রাধিকার পাবে রপ্তানিযোগ্য ও আমদানি-বিকল্প গুণোর উৎপাদক। আইসিটি ও প্রযুক্তিনির্ভর সৃজনশীল ব্যবসা, পশ্চাদপদ ও উপজাতীয় অঞ্চল এই সুবিধা পাবে। প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তা এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগও অগ্রাধিকার পাবে। তবে মুদি দোকান, ওষুল বিক্রেতা, হার্ডওয়্যার বিক্রেতা বা পরিবেশ দূষণকারী কোনো অনুৎপাদনশীল খাতে এই ঋণ দেওয়া হবে না।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থবিরতা দূর করতে বড় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক 'স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬' শীর্ষক একটি বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার এই তহবিলের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে। এটি গঠিত হবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের মাধ্যমে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে। এটি সরকারের গ্যারান্টির আওতায় পরিচালিত হবে।
এই প্যাকেজের আওতায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) খাতের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই তহবিল থেকে উৎপাদন ও শ্রমিকের মজুরি বাবদ ঋণ দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে এই খাতে প্রায় ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই দুটি খাত থেকে যথাক্রমে ২ লাখ ও ৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকার তহবিলের মধ্যেও ভাগ রয়েছে। এর মধ্যে কুটিবা ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও শিরদ গবেষকদের মতে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠন-বান্ধব। এটি খুর উদ্যোক্তনদের বিকাশে বড় বাধা। অথচ বড় ঋণের চেয়ে এসএমই ঋণে খেলাপি হওয়ার হার অনেক কম। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। এরপর বৈশ্বিক বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা কমে যাবে। সেই চালেঞ্জ মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ বাড়তে হবে। আর তার জন্য এসএমই থাতে জামানতবিহীন ও সহজ শর্তের অর্থায়নের বিকল্প নেই। আমাদের রেন্ডেড ফিনান্স ও ফিনটেকের দিকে দ্রুত এগোতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও কিছু বিষয়ে সতর্ক করেছেন। অতীতে অনেক প্রণোদনা তহবিল বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগ ছিল। তাই নতুন তহবিলের ক্ষেত্রে যেন এমনটা না হয়। তহবিল প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছাতে হবে। এর জন্য কটেজ, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কোটা নির্ধারণ করে দিতে হবে। অন্যথায় এই ঋণের সুবিধা সাধারণ উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে না। এটি কেবল ‘তেলে মাথায় তেল দেওয়ার’ মতো হবে।