× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিচার শেষ হয়নি ২৫ বছরেও

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১০ মিনিট আগে

প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। বাংলা নববর্ষের প্রথম সকাল। রাজধানীর রমনা বটমূলে চলছে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে আনন্দমুখর সেই পরিবেশ মুহূর্তেই রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।

হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জঙ্গিদের বোমা হামলায় নিহত হন ১০ জন, আহত হন অসংখ্য মানুষ। সেদিনই হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। কিন্তু ঘটনার ২৫ বছর পেরুলেও বিচার এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। হত্যা মামলার বিচার বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টে পৌঁছলেও বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনও বিচারাধীন। রাষ্ট্রপক্ষের ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ৫৪ জন। অন্যদিকে, হাইকোর্ট সংক্ষিপ্ত রায় দিলেও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ না হওয়ায় আসামিপক্ষ আপিল করতে পারছে না। একটি বহুল আলোচিত জঙ্গি হামলা মামলার বিচার যদি আড়াই দশকেও সম্পূর্ণ না হয়, তাহলে দেশের সাধারণ মামলাগুলোর পরিণতি কীÑ তা সহজেই অনুমান করা যায়। 

শুধু রমনা বটমূল নয়, ২০১৩ সালে রাজধানীর গুলশানে যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কী হত্যা মামলায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। অভিযোগ গঠনের আট বছর পরও ৭৫ জন সাক্ষীর মধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাত্র ১২ জন। সাক্ষীর অনুপস্থিতি, শুনানি পেছানো এবং পলাতক আসামির কারণে এর বিচার কার্যক্রম কার্যত ধীরগতিতে চলছে। এই দুটি আলোচিত মামলাই দেশের বিচারব্যবস্থার সামগ্রিক বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী সিরাজুল হক ফয়সাল বলেন, ‘সাক্ষীরা আদালতে আসেন না। দেড় বছর আগে একজন সাক্ষী এসেছিলেন, এরপর আর কেউ আসেননি।’ এই মামলাটি দেখায়, শুধু বিচারক নয়Ñ সাক্ষী ব্যবস্থাপনাও বিচার বিলম্বের বড় কারণ।

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি, হাইকোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি এবং অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

২০২৪ সালে আপিল বিভাগে নতুন মামলা হয়েছিল ৯ হাজার ৯১৫টি। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ৩১২টি। অর্থাৎ নিষ্পত্তির হার মাত্র ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর- এই তিন মাসেই নতুন মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৩০টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৬টি। অর্থাৎ নতুন মামলা যুক্ত হওয়ার হার এখনও নিষ্পত্তির চেয়ে বেশি। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারাধীন মামলার মধ্যে ফৌজদারি মামলা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে রিট মামলা, দেওয়ানি মামলা ও আদিম দেওয়ানি মামলা। অর্থাৎ শুধু অপরাধ নয়Ñ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাগরিক অধিকার এবং সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধও সমানভাবে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। 

দেশের প্রতিটি আদালতেই এখন মামলার পাহাড়। বর্তমানে আপিল বিভাগে মাত্র পাঁচজন এবং হাইকোর্ট বিভাগে ১০৩ জন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করছেন। এই ১০৮ জন বিচারপতির কাঁধে রয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯১ হাজার মামলা। অন্যদিকে সারা দেশের প্রায় আড়াই হাজার বিচারকের হাতে রয়েছে ৪০ লাখের বেশি মামলা। মামলার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সেই তুলনায় বাড়ছে না বিচারক, আদালত কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। 

কেন বাড়ছে মামলার জট 

আইনজীবী, বিচারক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কারণ বিচারকের স্বল্পতা। পাশাপাশি রয়েছে আদালত কক্ষের সংকট, জনবলের অভাব, তদন্ত প্রতিবেদনে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, অহেতুক শুনানি মুলতবি, আইনজীবীদের সময় প্রার্থনা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিহিংসামূলক ও মিথ্যা মামলা দায়েরের প্রবণতা। 

সুপ্রিম কোর্টের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে আপিল বিভাগে নতুন মামলা কিছুটা কমলেও পুরনো মামলার জট কমেনি। বরং নিষ্পত্তির চেয়ে দায়েরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর-মাত্র তিন মাসে আপিল বিভাগে নতুন মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৩০টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ২ হাজার ৩৯৬টি। অর্থাৎ প্রতি দুটি নতুন মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হচ্ছে প্রায় একটি

হাইকোর্টেও বাড়ছে চাপ

হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৬ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮২। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ফৌজদারি মামলা। এরপর রয়েছে রিট, দেওয়ানি এবং আদিম দেওয়ানি মামলা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অপরাধ বৃদ্ধি নয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ এবং সরকারি সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেও বিপুলসংখ্যক মামলা উচ্চ আদালতে আসছে। ফলে বিচারপতিদের ওপর চাপ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

প্রধান বিচারপতির সামনে কঠিন পরীক্ষা

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন জুবায়ের রহমান চৌধুরী। আগামী ২০২৮ সালের মে পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে থাকবেন। আইনজ্ঞদের মতে, তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মামলার জট কমানো, বিচারিক কার্যক্রমে গতি আনা, আদালতের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। শুধু বেঞ্চ বাড়ানো বা দ্রুত শুনানি নয়Ñ বিচারক নিয়োগ, আদালতের অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিচার ব্যবস্থার উন্নয়নও ত্বরান্বিত করতে হবে তাঁকে।

সরকারের পরিকল্পনা

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মামলার জট নিরসনে সরকার বিচারব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। ‘ই-জুডিসিয়ারি’ প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করলেই জট কমবে না। মামলার উৎপত্তিস্থলে নজর দিতে হবে। বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) আরও কার্যকর করতে হবে।

অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা পুরনো মামলাগুলোর জন্য পৃথক বেঞ্চ গঠন করা হলে দ্রুত ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। 

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকনের মতে, প্রতিহিংসাবশত দায়ের করা মিথ্যা মামলা বন্ধ না করলে মামলার জট কোনোভাবেই কমবে না। যারা হয়রানির উদ্দেশ্যে মামলা করেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘শুধু আদালতে নয়, মামলার উৎপত্তিস্থলেও সংস্কার প্রয়োজন। বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আদালতের অবকাঠামো উন্নয়ন, লজিস্টিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা ছাড়া এই সংকট কাটানো কঠিন।’

তিনগুণ বেড়েছে মামলা

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার সময় দেশে বিচারাধীন মামলা ছিল ১৫ লাখ ৭০ হাজার। উচ্চ আদালতে ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার মামলা। এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখেরও বেশি। অর্থাৎ মাত্র ১৮ বছরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি বিচারক, আদালত কিংবা বিচার ব্যবস্থার সক্ষমতা। আদালতের এই জট শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত।

রমনা বটমূলের বোমা হামলা কিংবা মিল্কী হত্যা মামলার মতো বহুল আলোচিত মামলাগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে, বিচার শুধু আদালতের রায় নয়; এটি সময়ের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা। আর সেই প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্র বারবার পিছিয়ে পড়ছে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নতুন আদালত ও বিচারক নিয়োগ, তদন্ত সংস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি, সাক্ষী ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, মিথ্যা মামলা নিয়ন্ত্রণ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি সম্প্রসারণ এবং বিচারব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তরÑ এসব উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন না হলে মামলার এই পাহাড় আরও উঁচু হবে। আর সেই পাহাড়ের নিচেই চাপা পড়ে থাকবে লাখো মানুষের ন্যায়বিচারের স্বপ্ন।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা