কান্নায় ভারী নিকুঞ্জের আকাশ
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ : ৩ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ৩ ঘণ্টা আগে
শিশু মাহাদী। ছবি: সংগৃহীত
মসজিদের মাইকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে তার নাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল তার নিষ্পাপ মুখের ছবি। একটি ছোট্ট শিশুর সন্ধানে গত একদিন ধরে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর প্রার্থনায় কেটেছে ঢাকার নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত এলাকার মানুষের সময়। সবাই অপেক্ষা করছিলেন একটি সুখবরের জন্য। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো এক হৃদয়বিদারক পরিণতিতে।
মঙ্গলবার সকাল থেকে নিখোঁজ থাকা তিন বছর বয়সী শিশু মাহাদীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৩০ ঘণ্টার উৎকণ্ঠা ও অনুসন্ধানের পর বুধবার বিকাল ৫টার দিকে নিকুঞ্জ-১ এর খেলার মাঠ সংলগ্ন জামতলা এলাকার একটি উন্মুক্ত জলাশয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাহাদী বরগুনা জেলার বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও স্মৃতি দম্পতির ছেলে।
শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পুরো এলাকাজুড়ে শুরু হয়েছিল অভূতপূর্ব এক মানবিক তৎপরতা। স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে সম্ভাব্য সব স্থানে অনুসন্ধান চালান। মসজিদের মাইকে চলে দফায় দফায় ঘোষণা। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাহাদীর ছবি ও পরিচয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু স্থানীয়রাই নন, প্রবাসীরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পুরো এলাকা যেন মাহাদীকে কেন্দ্র করে এক পরিবারে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু বুধবার বিকালে সব আশার আলো নিভে যায়। জলাশয়ে মাহাদীর মরদেহ পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই সেখানে শত শত মানুষ ভিড় করেন। স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ আর প্রতিবেশীদের চোখের জলে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। যে শিশুকে ফিরে পাওয়ার জন্য সবাই লড়েছেন, তাকে নিথর অবস্থায় দেখে শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েন উপস্থিত জনতা।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত অনেক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, শিশুটির মরদেহের অবস্থা এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। কেউ কেউ এটিকে ‘সন্দেহজনক মৃত্যু’ বলে দাবি করে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে খিলক্ষেত থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহরাব আল হোসাইন বলেন, “ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আইনগত কার্যক্রম শুরু করেছে। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আলামত সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে কোনো বিষয়কেই গুরুত্বহীনভাবে দেখা হচ্ছে না। যদি কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এ ব্যাপারে এলাকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও নিকুঞ্জ টানপাড়া কল্যাণ সোসাইটির আহ্বায়ক জাহিদ ইকবাল বলেন, “গতকাল সকাল থেকে মাহাদীর খোঁজে যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তা আমাদের সমাজের মানবিক শক্তির এক বিরল উদাহরণ।
“একটি শিশুর সন্ধানে পুরো নিকুঞ্জ, টানপাড়া ও খিলক্ষেত যেন এক পরিবারের মতো এক হয়ে গিয়েছিল। মসজিদের মাইক থেকে বারবার ঘোষণা হয়েছে, তরুণরা দল বেঁধে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ করেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো মানুষ তার ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছেন। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ ফোন করে শিশুটির খোঁজ জানতে চেয়েছেন। সবাই চেয়েছিল, মাহাদী সুস্থভাবে ফিরে আসুক।”
তিনি আরও বলেন, “আজ যখন শুনলাম মাহাদী আর নেই, তখন সত্যিই ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। একজন সাংবাদিক হিসেবে বহু হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি, কিন্তু একটি নিষ্পাপ শিশুকে ঘিরে এত মানুষের ভালোবাসা, প্রার্থনা ও আশার পর এমন সংবাদ মেনে নেওয়া খুবই কঠিন।”
একটি শিশুর হাসিতে মুখর থাকার কথা ছিল যে ঘর, সেখানে এখন কেবলই শূন্যতা। যে মা সন্তানের ফেরার আশায় দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তার বুক আজ বিদীর্ণ। পুরো নিকুঞ্জ ও খিলক্ষেতবাসীর মনে আজ একটাই প্রশ্ন—কেন এবং কীভাবে ঝরে গেল এই ছোট্ট প্রাণ? এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যেন মাহাদীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জনসমক্ষে আনা হয়।