সরকার গঠনের শুরু থেকেই সব ধরনের সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এগোচ্ছে বিএনপি। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের এই অবস্থানের কারণে গত রমজানের হাট-বাজারে চাঁদাবাজদের প্রভাব কমে আসে। শুধু তাই নয়, গত চার মাসে চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, যাদের মধ্যে বিএনপির নেতাকর্মীরাও রয়েছেন।
এরই মধ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে, জেলা যুবলীগের জ্যেষ্ঠ আহ্বায়ক খায়রুল ইসলাম সজীবকে আটকের পর সরকারের এই জিরো টলারেন্সের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। ঘটনাটিকে অনেকেই দেখছেন ইতিবাচক বার্তা হিসেবে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, সরকারের এমন পদক্ষেপ হাই-প্রোফাইল অপরাধী বা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এক ধরনের সতর্কবার্তা। তারা বলছেন, অভিযুক্ত অপরাধী যে-ই হোক, তাকে অভিযুক্ত হলেই জবাবদিহিতার প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসার নীতিতে চলতে পারলে তা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানাচ্ছে, বেশ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও একটি বড় শিল্প গ্রুপের গাড়িতে চাঁদা দাবি এবং বাধা দেওয়ার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) খায়রুল ইসলাম সজীবকে গত রবিবার বিকালে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে হেফাজতে নেয়। এমপি আজাহারুল ইসলাম মান্নানের এই ছেলেকে প্রথমে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে, পরে ঢাকার মিন্টো রোডে ডিবি সদর দপ্তরে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে এবং মুচলেকা দেওয়ার শর্তে রবিবার গভীর রাতেই তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনার পরপরই সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগে খাইরুল ইসলাম সজীবকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদল।
যা বলছেন মন্ত্রী ও এমপি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই সোনারগাঁ আসনে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে। মূলত মেঘনা গ্রুপ থেকে সজীবের নামে একটি মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। যার ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”
তিনি অভিযোগ করেন, ‘৫ আগস্টের আগে মেঘনা গ্রুপের কারখানায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রায়ই যেতেন। সেখানে গেলেই তিনি আমাকে বকাবকি করতেন। ওই সময় তারা ক্ষমতার জোরে আমার অনেক সম্পত্তি দখল করে নেয়। ৫ আগস্টের পর আমরা সেই ন্যায়সঙ্গত সম্পত্তি উদ্ধার করার উদ্যোগ নিই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল হয়তো আমার ছেলেকে জড়িয়ে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ দিয়েছেন। সেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ আমার ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।’
এ ঘটনা সম্পর্কে গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “খাইরুল ইসলাম সজীবের নামে পুলিশের কাছে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত যাচাই এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপির ছেলের কি কোনো বিশেষ অধিকার আছে? আইনের চোখে তো সবাই সমান। পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলোর ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে নেওয়া হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা পারিবারিক অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবেই পুলিশ এ পদক্ষেপ নিয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজন মনে করেছে বলে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছে।”
যেভাবে সাঁড়াশি অভিযানের শুরু
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার যেকোনো ধরনের অনিয়ম, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখবে।’ এরপরই দেশজুড়ে চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি গ্রহণের জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তর জানিয়েছে, গত ১ মে শুরু হওয়া চলমান বিশেষ অভিযানে সারা দেশে পুলিশের অভিযানে ১৮ হাজার ৩২৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এদের মধ্যে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচির নামে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী, পরিকল্পনাকারী ও তাদের সহযোগী হিসেবে ১ হাজার ৯৫৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ৩৩১ জন অবৈধ অস্ত্রধারী, ১৩ হাজার ২০ জন চোরাকারবারি/মাদক ব্যবসায়ী, ২ হাজার ২১১ জন ছিনতাইকারী, দস্যু ও ডাকাত এবং ৮০৮ জন চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক সময় এমপি-মন্ত্রীদের নাম ভাঙিয়ে তাদের আত্মীয়-স্বজন নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। এমন কোনো অভিযোগ পেলে তা যাচাই কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করার সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগ ও ব্যবস্থাগুলো জনগণকে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, এসব বিষয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে।’
তিনি বলেন, “আমাদের দাবি হলো, এর ধারাবাহিকতা সরকার যেন ধরে রাখতে পারে। বিগত সময়ে দেখেছি কোনো নতুন সরকার গঠনের শুরুতে ৩ থেকে ৬ মাস যে ধরনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে, ৬ মাস পরে তা অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে এমনটা যেন না হয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এই সরকার যেভাবে চলছে সামনেও যেন সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। ভবিষ্যতেও যেন এ ধরনের অভিযুক্ত হাই-প্রোফাইল অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকার যেন কোনো কার্পণ্য না করে। সরকারের এমন অবস্থান অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হবে।”