পুরান ঢাকার ইসলামপুর
বোরহান উদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে
পুরান ঢাকার ইসলামপুরের ঐতিহ্যবাহী পাইকারি বাজারের এমন চিত্র প্রতিদিনের। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
পুরান ঢাকার সরু গলি, মানুষের ভিড় আর অসংখ্য কাপড়ের দোকানÑ এই চিত্রই বলে দেয়Ñ এটি ইসলামপুর বাজার। দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি কাপড়ের কেন্দ্র এই বাজার ঈদ, পূজা কিংবা যেকোনো উৎসবে সারা দেশের ব্যবসায়ীদের কাপড়ের চাহিদা পূরণে রাখছে ব্যাপক ভূমিকা।
এখান থেকেই দেশের নানা প্রান্তের দোকানে পৌঁছে যায় শাড়ি, থ্রি-পিস, লুঙ্গি, থান কাপড়, বেডশিট ও পোশাক তৈরির বিভিন্ন কাপড়। তবে সময়ের পরিক্রমায় তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষে ২৫৩ বছরের পুরনো এ বাজারেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া।
নানা রকম পরিবর্তনের মাধ্যমে এ বাজারের ব্যবসায়ীরা তথ্যপ্রযুক্তির প্লাটফর্মে নিজেদের পণ্য বিক্রি বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি আধুনিক বাণিজ্যে ঝুঁকছেন। অনেক প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার শুরু করেছে। এখন অনেক ক্রেতা সশরীরে ইসলামপুর না এসে অনলাইনে অর্ডার দিচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা ক্রেতার চাহিদামাফিক পণ্য পার্সেল বা কুরিয়ার করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পণ্য সরবরাহ করছে।
২৫ বছরের বেশি সময় ব্যবসা পরিচালনাকারী কাপড় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, একসময় ঈদের মৌসুমে দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা পাওয়া যেত না। এখন ব্যবসা হচ্ছে, তবে সেই আগের ভিড় আর নেই। বাজারের ধরন বদলেছে, ক্রেতাদের অভ্যাসও বদলেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এখনও ব্যবসায়ীরা ইসলামপুরে আসেন, তবে আগের মতো না। অনেকেই এখন অনলাইনে অর্ডার দেন। ফলে ব্যবসার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে।
ইতিহাসের তথ্য বলছে, ১৭৭৩ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে পাইকারি কাপড়ের বাজার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মুঘল সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতির নামানুসারে ১৬১০ সালের পর থেকেই এই এলাকাটির নামকরণ ও বসতি গড়ে ওঠে। পুরান ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীসংলগ্ন ইসলামপুর বাজার ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর আরও বিস্তৃত হয়। এখানে ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক হাজার দোকান রয়েছে। বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় এই বাজারে। বিশেষ করে রমজান ও দুই ঈদের আগে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।
ব্যবসায়ীদের মতে, যানজট, পণ্য পরিবহনের বাড়তি সময় ব্যয় এবং বাজারের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ইসলামপুরে ব্যবসা পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব প্রতিবন্ধকতার পরেও বাজারটির গুরুত্ব সেভাবে কমেনি। তাদের দাবি, দেশের যেকোনো প্রান্তের ব্যবসায়ী এখনও এক জায়গায় সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যের কাপড়, প্রতিযোগিতামূলক কম দাম ও বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্কের সুবিধা এখানেই পেয়ে থাকেন। তাই প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও যানজট নিরসন করা গেলে ইসলামপুরের ব্যবসা নতুন গতি পাবে। দেশের বস্ত্র বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এর অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।
তবে ব্যবসার ধরন যে পরিবর্তন হয়েছে, সে প্রসঙ্গে থ্রি-পিস বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে একজন ক্রেতা তিন-চার দিন বাজারে থেকে পণ্য কিনতেন। এখন মোবাইল ফোনে ছবি দেখে অর্ডার দেন। তারপর ঢাকায় এসে এক দিনেই সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আবার কেউ কেউ না এসেই মোবাইলে ছবি পাঠিয়ে পণ্য কিনছেন, আমরা দায়িত্ব নিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি তাদের ঠিকানায়।
‘ইসলামপুরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এক জায়গায় সব ধরনের কাপড় পাওয়া যায়। এ কারণে দেশের অনেক ব্যবসায়ীর প্রথম পছন্দ এখনও এই বাজার।’Ñবলেন কুষ্টিয়া থেকে কেনাকাটা করতে আসা আমিরুল মোমিন। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মূলত শাড়ি কিনি এই মার্কেট থেকে। তবে সবরকম কাপড়ই পাওয়া যায়, তাই দরকার পড়লে অন্য কাপড়ও কিনি। আমাদের আস্থায় এখনও এই মার্কেট।
দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ব্যবসা পরিচালনাকারী হুমায়ুন কবির জানান, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দোকান ভাড়া, পরিবহন খরচ ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। খরচ বাড়লেও লাভ সেই হারে বাড়েনি। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা কামরুল হাসান বলেন, আমরা এখন দোকানের পাশাপাশি অনলাইনেও বিক্রি করছি। ফেসবুক ও কুরিয়ার সেবার কারণে ইসলামপুরের পণ্য এখন সহজেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। লাইভ ভিডিও প্রচারসহ নানামুখী ডিজিটাল কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছি। এতে বিক্রি বাড়ছে।
দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের সঙ্গে ইসলামপুরের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য এটি এখনও সবচেয়ে বড় পাইকারি উৎস। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আধুনিক গুদাম ব্যবস্থা ও যানজট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ইসলামপুর তার হারানো গৌরব আরও শক্তভাবে ধরে রাখতে পারবে।
ইসলামপুরের গুলশান আরা সিটির ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা সপ্তাহজুড়ে ইসলামপুরে এসে পণ্য কিনতেন। এখন অনেকেই অনলাইনে যোগাযোগ করে অর্ডার দিচ্ছেন। ফলে বাজারের প্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি জানান, ইসলামপুর এখনও দেশের সবচেয়ে বড় কাপড় বাজার। তবে এখন জেলা পর্যায়েও বড় বড় পাইকারি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এতে ক্রেতাদের একটি অংশ স্থানীয় বাজারের দিকে ঝুঁকছে।
কাপড় কিনতে আসা খুলনার ব্যবসায়ী হাসানুল বান্না প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইসলামপুরে আসা মানেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা। অনেক সময় গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই এখন পারতপক্ষে কম আসি এ বাজারে। অনলাইনে কেনাকাটা করি। আবার খুলনার পাইকারি বাজার থেকে অল্প সময়ের মধ্যে দরকারি কাপড় কিনি।
ইসলামপুরের বাজারে পাওয়া যায় রাজশাহীর সিল্ক, জামদানি, কাতান থেকে শুরু করে ভারত, চীন ও পাকিস্তানের আমদানি করা বিভিন্ন ধরনের কাপড়। থ্রি-পিস, শাড়ি, বোরকা, পাঞ্জাবি ও শার্টের কাপড়, শিশুদের পোশাকের কাপড়Ñ সবকিছুর বিশাল সংগ্রহ রয়েছে ইসলামপুরে। একসময় দেশের কাপড় ব্যবসার প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ ছিল এই বাজারের হাতে। কিন্তু বর্তমানে অনলাইন ব্যবসা, বিভিন্ন জেলায় গড়ে ওঠা নতুন পাইকারি বাজার ও সরাসরি আমদানিকারকদের বিক্রি কার্যক্রমের কারণে ইসলামপুরের একচ্ছত্র আধিপত্য কিছুটা কমেছে। অনেক ব্যবসায়ী এখন সরাসরি কারখানা কিংবা আমদানিকারকদের কাছ থেকেও পণ্য সংগ্রহ করছেন।