হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী। কোলাজ: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চলমান হামের প্রকোপের মধ্যেই বাড়ছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ। হামে প্রতিদিনই মৃত্যু ঘটছে রোগীদের, আক্রান্তের সংখ্যাবৃদ্ধিও থেমে নেই। গত ২৪ ঘণ্টায়ও (২২ জুন থেকে ২৩ জুন সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর এই সময়ে সারা দেশে সন্দেহজনক হামে বা হাম উপসর্গের রোগী পাওয়া গেছে ১ হাজার ৯ জন এবং ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে ১২৬ জন। এর সঙ্গে গত টানা তিন দিনের (তিনজনের মৃত্যু এবং ৪৮০ জন আক্রান্ত) ডেঙ্গু পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যে বিপর্যয় ঘটার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর এ পর্যন্ত (মঙ্গলবার সকাল ৮টা) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৫ হাজার ১৬০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছে ১০ জন। অন্যদিকে, ১৫ মার্চ থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে হামের সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৭৬৪ জনে দাঁড়িয়েছে। যার মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ২৯৭ জনের এবং সন্দেহজনক হামে ৫৯৩ জন ও নিশ্চিত হামে ৯৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে দেশের জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর এই দ্বিমুখী প্রকোপে দেশে জটিল জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
সরকারের রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হাম ও ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। শুধুমাত্র হাসপাতালে ডাক্তার-নার্স কিংবা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বাড়িয়ে এর সমাধান হবে না। এজন্য এখন কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। কমিউনিটি পর্যায়ে এই রোগ শনাক্ত করা, তাদের পৃথকভাবে যত্ন নেওয়া এবং সেকেন্ডারি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে হাসপাতালে জটিল রোগীর সংখ্যা কমবে। এমন করতে পারলে পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসাও অনেকটা সম্ভব হবে।’
ডা. মুশতাক বলেন, ‘পাবলিক হেলথ অ্যাপ্রোচের প্রথম কথাই হলো, জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে স্বাস্থ্যকর্মী দিয়ে কারা রোগী তা খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে। তারপর রোগীর কাছ থেকে সুস্থ মানুষকে আলাদা করে রোগীদের চিকিৎসা ও পরিচর্যা করতে হবে। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকার থেকে শুরু করে বর্তমান সরকার পর্যন্ত সবাই শুধু আইসিইউ কতটা আছে, অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটর কয়টা আছে, কতজন ডাক্তার আছে, কত টাকার যন্ত্রপাতি কেনা হলো, কত টাকা বরাদ্দ করা হলোÑ এর মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এভাবে কোনোভাবেই বর্তমান হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য আমাদের অতিমাত্রায় কেন্দ্র নির্ভরতা এবং যন্ত্রপাতি নির্ভরতা কমিয়ে কমিউনিটি পর্যায় থেকে কাজ শুরু করতে হবে। র্যাপিড রেসপন্স করতে হবে।’
হাম নিয়ন্ত্রণে অন্তরায়
জনস্বাস্থ্যবিদরা মনে করছেন, হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসার প্রধান কারণ দেশের সবখানে ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া। যদিও জাতীয় পর্যায়ে হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের কাভারেজ ১০৩% দেখানো হয়েছে, কিন্তু অনেক জায়গায় মাইক্রো-প্ল্যান একুরেট বা সঠিক হয়নি। কিছু শিশু বাদ পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করে টিকা দেওয়া না হলে হামের প্রকোপ কমানো সম্ভব হবে না এবং সারাবছর হামের প্রাদুর্ভাব চলতে থাকবে।
হামের টিকাদান কার্যক্রম বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতির কারণে টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। সাধারণত মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের তালিকা তৈরি করেন। কিন্তু এবার সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে গত বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কিছু যোগ-বিয়োগ করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন কাজের পরিবর্তে অনেক সিদ্ধান্তই অনলাইন মিটিং বা ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে মাঠ পর্যায়ে সঠিক তালিকা তৈরি না হওয়ায় এখন যারা টিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের শনাক্ত করে দ্রুত টিকার আওতায় আনা জরুরি। বিশেষ করে, যাদের দ্বিতীয় ডোজ বাকি রয়েছে, তাদের টিকা নিশ্চিত না করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।’
স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণে অনীহা এবং ঘাটতিও সংক্রমণ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে জ্বর নিয়ে আসা রোগীদের মধ্যে কারা হামে আক্রান্ত এবং কারা নয় তা আলাদা করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। একইভাবে জ্বরের রোগীদের আলাদা করে রাখা, পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা বা আইসোলেশন-কোয়ারেন্টাইনের মতো মৌলিক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর হয়নি। ফলে রোগী থেকে রোগীতে সংক্রমণ অবাধে ছড়িয়েছে। ফলে হাম পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে নাÑ আসেনি।
টিকার কাভারেজের হিসাবে এবং বাস্তব টিকাদানের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে জানিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, ‘সরকারের হিসাবমতে এমনকি ৯০ শতাংশের ওপরেও যদি টিকা কাভারেজে আসতে, তাহলে দেশে হামের রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু সংখ্যা কমে আসত।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. তাজউদ্দিন শিকদার বলেন, ‘টিকাদান কর্মসূচির আওতার বাইরে থেকে যাওয়া শিশুদের কারণে কমিউনিটিতে একটি ‘কমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হচ্ছে, যা হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিদ্যমান উদ্যোগ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ডেঙ্গু প্রতিরোধে অগ্রিম পদক্ষেপ নিয়েছে, স্থানীয় সরকার আয়োজন করে মশানিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গতকাল মঙ্গলবার ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। টাস্কফোর্সটি মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এই টাস্কফোর্স মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি করবে, প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবে, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াবে এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কাজ করবে।
সভাপতির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।’ এ সময় তিনি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বে-সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেন।
উল্লেখ্য, ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে সরকারের কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত ও কার্যকর করতে সম্প্রতি জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বাধীন এ কমিটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু শুধু রাসায়নিক ধোঁয়া দিয়ে উড়ন্ত মশা মারলেই হবে না, মশার লার্ভা মারার জন্যও ব্যাপকভাবে কাজ করতে হবে। রোগীদের অনুসন্ধান করতে এবং তাকে সুস্থদের কাছে থেকে আলাদা করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হবে, যত্ন নিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে ভলান্টিয়ার সম্পৃক্ত করে নিবিড়ভাবে মশা খুঁজতে হবে, পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করতে হবে এবং উপযোগী কীটনাশক/কেমিক্যাল প্রয়োগ করে মশা নিধন কার্যক্রম আরও জোরালো করতে হবে। তা না হলে ডেঙ্গু কমবে নাÑ অন্যান্য বছরের মতো ডেঙ্গুর প্রকোপ চলতে থাকবে।’