কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব
প্রকাশ : ৭ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। ছবি: বাসস
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাচ্যুত ও নিষিদ্ধ হওয়ার পর গত ২২ মাসে দলটির নেতা-কর্মী, সমর্থক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সারা দেশে ১ হাজার ৮৬৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ২ লাখ ২৫ হাজারেরও বেশি। হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নাশকতা, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, দুর্নীতি, অর্থপাচার এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ-বিভিন্ন অভিযোগে এসব মামলার জালে জড়িয়ে পড়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, বিচারপতি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা।
পুলিশ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামোর প্রায় প্রতিটি স্তরই এখন মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি। দলের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন; এছাড়া দেশের মধ্যে যারা আছেন, তারাও রয়েছেন আত্মগোপনে।
মামলার ভারে বিপর্যস্ত নেতা-কর্মীরা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সারা দেশে দায়ের হওয়া ১ হাজার ৮৬৮টি মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ২৩ জন সাবেক মন্ত্রী, ১১ জন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী, ৬৬ জন সাবেক সংসদ সদস্য এবং সংরক্ষিত নারী আসনের ৮ জন সাবেক এমপি। এসব মামলার বড় অংশই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মোট মামলার মধ্যে ৭৯৯টি হত্যা মামলা এবং ১ হাজার ৬৩টি হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য ধারার মামলা। রাজধানী ঢাকাতেই দায়ের হয়েছে ৭০৬টি মামলা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মহানগরের ৫০টি থানায় এসব মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত অল্প সময়ে কোনো একক রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এত বিপুল সংখ্যক মামলা হওয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।
তদন্তে ধীরগতি, ঝুলে আছে অধিকাংশ মামলা : তবে মামলার সংখ্যা বাড়লেও এগুলোর তদন্ত কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মধ্য জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৮৬২টি মামলার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ২৪২টির। এর মধ্যে ৬০টিতে আদালতে অভিযোগপত্র এবং ৩৫টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। বাকি মামলাগুলোর তদন্ত চলমান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ঘটনায় বিপুল সংখ্যক আসামি, বহু সাক্ষী এবং রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর পরিস্থিতির কারণে তদন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আইনি ও প্রক্রিয়াগত কারণে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলেও দেরি হচ্ছে।
দুর্নীতির অভিযোগে নতুন চাপ
রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নেতাদের বিরুদ্ধে ১২ হাজার ৮২৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে এখন পর্যন্ত ৩৯৯টি মামলা করা হয়েছে। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। অর্থাৎ মামলার সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ৮০ মামলা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত ঘটনাগুলো নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও ব্যাপক বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৮০টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় শেখ হাসিনাসহ ৪৬৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৭৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক রয়েছেন ২৮৮ জন। ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানি ইতোমধ্যে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
কারাগারে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা
৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির উপদেষ্টা পরিষদ, সভাপতিমণ্ডলী, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ এবং মন্ত্রিসভার সাবেক সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে কারাগারে। গ্রেপ্তার হওয়া উল্লেখযোগ্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেনÑ সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু, রমেশ চন্দ্র সেন, ড. আব্দুর রাজ্জাক, ফারুক খান, শাজাহান খান, কামরুল ইসলাম, দীপু মনি, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, টিপু মুনশি, সাধন চন্দ্র মজুমদার, আসাদুজ্জামান নূর, নুরুল ইসলাম সুজন, মাহবুব আলী, জুনাইদ আহমেদ পলক, আতিকুল ইসলাম, হাজী মোহাম্মদ সেলিম, শামসুল হক টুকু, ফরহাদ হোসেনসহ আরও অনেকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে অন্তত তিন শতাধিক ব্যক্তি বর্তমানে বিভিন্ন কারাগারে রয়েছেন। এদিকে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সম্প্রতি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।
বিদেশে চলে গেছেন অনেক নেতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বহু শীর্ষ নেতা দেশ ত্যাগ করেন। দলীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রধান গন্তব্য হয়েছে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সবচেয়ে বেশি নেতা আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দেশটিতে বর্তমানে আওয়ামী লীগের তিন শতাধিক নেতা অবস্থান করছেন।
দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে ভারতে যান। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও কয়েক মাস আত্মগোপনে থাকার পর দেশ ত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থান করছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন দলের অনেক প্রভাবশালী নেতা। তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আ ক ম মোজাম্মেল হোসেন, আবদুর রহমান, ড. হাছান মাহমুদ, শ ম রেজাউল করিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, শেখ ফজলে নূর তাপস, নূরে আলম চৌধুরী লিটন, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনসহ আরও অনেকে। এ ছাড়া ভারতের বিভিন্ন শহরে অবস্থান করছেন জাহাঙ্গীর কবির নানক, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আফজাল হোসেন, সুজিত রায় নন্দীসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আরও নেতা।
বিচারিক প্রক্রিয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক পুনর্গঠন নয়; বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া। কারণ দলটির প্রায় সব স্তরের নেতারা কোনো-না কোনো মামলার আসামি।
একদিকে হাজারো মামলার তদন্ত, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও দুদকের কার্যক্রম মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সামনে দীর্ঘ আইনি লড়াই অপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের প্রত্যাবর্তন, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এখন পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি নিষিদ্ধ দলটির নেতাকর্মীদের মামলা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার দিকে; যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কার্যক্রম নিষিদ্ধের আইনি নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলটির রাজনীতিতে ফিরে আসার বিষয়টিও অনেকাংশে নির্ভর করছে বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইনি সমাধানের ওপর।
অভিমত
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আত্মগোপনে থাকা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘শুধু ষড়যন্ত্রের কথা বলে ব্যর্থতা বা দুর্বলতা ঢাকার সুযোগ নেই। দলের আজকের এই পরিণতির জন্য সুবিধাবাদী একটি অংশেরও দায় রয়েছে। দলের ত্যাগীদের কোণঠাসা করে তারা দলীয় পদ-পদবির জোরে নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। যে কারণে জনগণের কাছে দলের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। ৫ আগস্টের আগেই এই অংশটি দেশ থেকে পালিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মামলার মুখোমুখি হলেও ন্যায়বিচারের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ জনগণের সমর্থন নিয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘একদিকে আইনি নিষেধাজ্ঞাজনিত কারণে গ্রেপ্তার ও শাস্তির ভয়, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ক্ষমতার দাপট হারিয়ে ফেলা সাধারণ কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনাÑ এই দুই চ্যালেঞ্জ পাড়ি দেওয়া দলটির জন্য বড়ই কঠিন হবে।’ তিনি বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হলে এ দলের সিনিয়র নেতাদের সবার আগে তাদের মামলাগুলো আইনিভাবে মোকাবিলার পথে আসতে হবে। প্রয়োজনে জেলে যেতে হবে। না হলে শুধু কর্মীরা জীবনবাজি ধরে রাজপথে নামবেন না।’