× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কার্বন বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে

দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মেগাপ্রকল্প নিয়েছে সরকার। প্রতীকী ছবি

দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মেগাপ্রকল্প নিয়েছে সরকার। প্রতীকী ছবি

পাঁচ দশকে দেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই অসহনীয় তাপপ্রবাহ রুখতে দেশজুড়ে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মেগাপ্রকল্প নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে কার্বন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আয় ও সাড়ে ৩ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছর ২ কোটি কেওড়াসহ মোট ৫ কোটি চারা রোপণ করা হচ্ছে।

গ্রামগঞ্জের ছায়াসুনিবিড় বটতলার হাটের ঐতিহ্য হারিয়েছে অন্তত দুই দশক আগে। এখন গ্রাম থেকে শহরÑ সর্বত্রই কংক্রিটের রাজত্ব। গাছের ডালের শীতল হাওয়ার বদলে মাথার ওপর ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা; হাতপাখাও এখন নিছক শৌখিনতায় পরিণত হয়েছে। দক্ষিণা হাওয়া এখন আর ঘরে উঁকি দেয় না। কারণ, চারপাশ থেকে দ্রুত কমে যাচ্ছে গাছপালা, ভরাট হয়ে যাচ্ছে জলাধার। সামর্থ্যবানদের ঘরে হয়তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ঢুকেছে, কিন্তু নির্মল বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার উন্মুক্ত স্থান ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। চারপাশ যেন উত্তপ্ত উনুনের মতো পুড়ছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, জলাশয় ভরাট, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহনের কালো ধোঁয়া এবং গ্রিনহাউস গ্যাসের অত্যধিক নিঃসরণই এই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মূল কারণ। দেশীয় গবেষণা বলছে, গত তিন দশকে রাজধানী ঢাকার তাপমাত্রা স্থানভেদে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। আর ২০২৫ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাঁচ দশকে দেশে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তাপজনিত রোগের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

২০২৪ সালে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব অটোয়ার ‘অ্যান আনসাস্টেইনেবল লাইফ : দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিট অন হেলথ অ্যান্ড দ্য ইকোনোমি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাপজনিত রোগের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকা দেশগুলোর তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় এবং রাজধানী ঢাকাকে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ভয়াবহ এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দেশব্যাপী ব্যাপক বৃক্ষরোপণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আগামী ৫ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণের মেগাপ্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু পরিবেশ রক্ষাই নয়, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কার্বন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আয়েরও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৩ জুন কক্সবাজারে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় মালুমঘাট সংরক্ষিত বনে গাছের চারা রোপণ শেষে তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে বুক ভরে মুক্ত বাতাস গ্রহণ করতে পারে, সেজন্য দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই গাছ লাগানো প্রয়োজন।

এর আগে, ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় কার্বন ক্রেডিট বিক্রির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

কার্বন বাণিজ্যে বিশেষ নজর

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ২৩ ফেব্রুয়ারি ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সেল’ গঠন করেছে। এই সেল চলতি বছরই ৫ কোটি গাছ রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মধ্যে ২ কোটি কেওড়া গাছ। সুন্দরবন তথা উপকূলীয় অঞ্চলের অত্যন্ত উপকারী এই গাছটিকে বেছে নেওয়ার প্রধান কারণ হলো এর উচ্চমাত্রার কার্বন শোষণের ক্ষমতা।

সেলের সদস্য ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ জামাইল বশীর জেবি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কেওড়া গাছ সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কার্বন গ্রহণ করে থাকে। এটি শুধু কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে বায়ুদূষণই রোধ করবে না, আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনেও বড় ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া উপকূলীয় বন সৃষ্টি ও ভূমিক্ষয় রোধেও এটি অত্যন্ত কার্যকর।’

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী এই প্রতিবেদককে বলেছেন, বর্ষা মৌসুমেই বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেড় কোটি গাছ রোপণ করা হবে। শুধু কক্সবাজার, টাঙ্গাইল ও চট্টগ্রামেই রোপণ করা হবে ১ কোটি ২ লাখ চারা।

কার্বন বাণিজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশীদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কার্বন ক্রেডিট হলো এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে গাছ কর্তৃক শোষিত কার্বনের ওপর ভিত্তি করে অর্থ পাওয়া যায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি টন কার্বনের মূল্য ৫১ ডলার। বাংলাদেশে এটি ৭০-৮০ ডলারে বিক্রি করা সম্ভব হতে পারে। এই পদ্ধতিতে গাছ না কেটেই পূর্ণাঙ্গ হওয়া পর্যন্ত ২৫ বছর ধরে প্রতিবছর অর্থ পাওয়া সম্ভব, যা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।’

কেওড়া গাছের উপকারিতা সম্পর্কে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. নবিউল ইসলাম খান এ প্রতিবেদককে বলেন, একটি কেওড়া গাছ সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ বছর বাঁচে। গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর জমিতে থাকা কেওড়া গাছ গড়ে ১০ টন পর্যন্ত কার্বন শোষণ করতে পারে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ রায়হান কাওছার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৬টি বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার সমন্বয়ে সারা দেশে এ বছর নির্ধারিত গাছগুলো রোপণ করা হবে। রোপণকৃত গাছের বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণে একটি অ্যাপও তৈরি করা হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে যারা চারা উৎপাদন ও রোপণ করবেন, তাদেরকে সরকারিভাবে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে।’

বাজেটে কার্বন বাণিজ্য ও কর্মসংস্থান

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বনায়নের এই মেগাপ্রকল্পের মাধ্যমে দেশে সাড়ে ৩ লাখ সবুজ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দেশের উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনের ৫০ শতাংশকে কার্বন বাণিজ্য কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। মন্ত্রী জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৯৬০ হেক্টর ব্লক বাগানে ৪ কোটি ২৮ লাখ ৯৭ হাজার, ৩ হাজার ৭২৭ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগানে ৩৭ লাখ ২৭ হাজার ও ৪ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগানে ১ কোটি ৭৭ লাখ ৭৬ হাজার চারা রোপণ করা হবে। এ ছাড়া বসতবাড়িতে বনায়নের জন্য আরও ৫৬ লাখ চারা রোপণ করা হবে। পাশাপাশি ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ কর্মসূচির আওতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ বসতবাড়িতে আরও এক কোটি গাছ লাগানো হবে। এ ছাড়া, তুলাচাষে কার্বন বাণিজ্যেরও পথ খুলছে। এতে প্রতি হেক্টর জমির জন্য কৃষককে ২০০ ডলার দেওয়া হবে।

শেয়ার করুন-

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা