প্রতীকী ছবি।
শীর্ষ সন্ত্রাসী ও দাগি আসামি এবং ছিনতাইকারী চাঁদাবাজদের মতো অপরাধীরা বারবার গ্রেপ্তার হয়েও যেন থামছে না। গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ে কারাগার থেকে বের হয়ে ফের একই অপরাধে জড়াচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, স্বয়ং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের পক্ষ থেকেও সম্প্রতি উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বড় বড় অপরাধী বারবার কারাগারে থেকে অল্প সময়ে কীভাবে বের হয়ে যাচ্ছে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকে ক্ষোভ ঝেড়েছেন। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এ প্রক্রিয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। এতে প্রশ্নও উঠছেÑ আইনের ফাঁকেই কী বের হয়ে যাচ্ছে অপরাধ চক্র?
কয়েক মাস আগে একটি গ্যাসের দোকানে চাঁদা দাবির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ফারুক ওরফে কাইল্লা ফারুককে সম্প্রতি হাতকড়া পরিয়ে তাকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে মাইকিং করেছিল পুলিশ। গ্রেপ্তারের মাত্র চার মাসের আগেই জামিনে বের হন তিনি। এবার তার বিরুদ্ধে ফের চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার রাতে চাঁদার দাবি পূরণ না হওয়ায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের অদূরে কেরানীগঞ্জে বেসরকারি একটি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের একাধিক গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, মোহাম্মদপুরের চিহ্নিত চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত ফারুক ওরফে কাইল্যা ফারুকের নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটেছে। ফারুকের মতো এমন বহু অপরাধী জামিনে বের হয়ে ফের একই অপরাধে জড়াচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে এসব অপরাধীকে ঠেকাতে দুর্বল আইন নতুন করে সাজানোর মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। যেন অপরাধীরা কোনোভাবেই পার না পায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি, জামিনের শর্ত কঠিন করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে পুলিশের দাবি, তারা কেবল ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমের একটা অংশ। তদন্ত, আটক ও গ্রেপ্তারের পর তাদের প্রায় ৯০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে যায়। বাকি সিস্টেমটা যারা সংশ্লিষ্ট তারা ভেবে দেখতে পারে। রামিসা হত্যার বিচার যেভাবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা হয়েছে, এ ধরনের কোনো প্রসেসে যদি ছিনতাইকারী এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে দ্রুততম বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে করা যেত তাহলে জনগণ আরও বেশি নিরাপদ বোধ করত।
অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পর অল্প সময়ের মধ্যে জামিনে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। সাম্প্রতিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মাদক, ছিনতাই ও অস্ত্রবাজির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িতরাও দ্রুত জামিন পেয়ে বাইরে আসছে, যা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ।
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামিনে বের হওয়া অপরাধীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, হুমকি এবং অস্ত্রের মহড়া দেওয়ার মতো অভিযোগ পাওয়া যায়। জামিনে বের হওয়ার পর অধিকাংশ অপরাধী আবার তাদের আগের চক্রে ফিরে যায়। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তবে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেকেই জামিন পেয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে বাংলদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খাদেমুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যখন শুধু প্যানেল কোডে মামলা হয় তখন এ ধরণের মামলাগুলো একটা সময়ে আইন অনুযায়ী দুই থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে জামিনের উপযুক্ত হয়। মামলা দায়েরের পর বছরের পর বছর চার্জশিট দাখিল না হওয়ায় আসামিরা জামিন পেয়ে যায়। যেমন ধরেন ডাকাতির প্রস্তুতি, ছিনতাইয়ের চেষ্টা এইরকম শব্দ যখন কোনো এজাহারে লেখা থাকে তাহলে সেটি প্রমাণ করার ব্যাপার আছে। যেহেতু সে অপরাধটা করে নাই তখন সন্দেহ থেকে যায়। সেই সন্দেহের জায়গা থেকে জামিনগুলো হয়।
তিনি বলেন, আসামিদের যখন গ্রেপ্তার করা হয় তখন যদি কোনো আলামত উদ্ধার থাকে, যেমন বিদেশি অস্ত্র, মাদক তখন মাঝেমধ্যে আলদা মামলার পরিকল্পনা করে। এসব মামলার জন্য আগে আলাদা মনিটরিং সেল থাকত সরকারের। যখন আসামি পেশাদার অপরাধী হত ওই আসামিকে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতো। ফলে জামিনের প্রক্রিয়াটা একটু বিলম্বিত হতো। এই ব্যবস্থাটা এখন আর আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এসব অপরাধীর ক্ষেত্রে কোর্টে আগে থেকে কিছু নির্দেশনা থাকত সরকারের পক্ষ থেকে আনঅফিসিয়ালি। দেখা গেছে, যেসব অপরাধী গ্রেপ্তার হচ্ছেন তাদের অনেকে শক্তিশালী আইনজীবী ধরে অল্প দিনে জামিন নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন। এ আইনজীবীর ভাষ্য, যেসব অপরাধ আইনের দৃষ্টিতে বড় অপরাধ না। কিন্তু মানুষের জনজীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এগুলোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনকে আরও ‘মোডিফাই’ করা উচিত। কেনো বারবার জামিন পেয়ে যাচ্ছে সরকারের এসব বিষয় খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, ছিনতাই কিন্তু আর ছিনতাইয়ের মধ্যে থাকছে না, খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে। আইনের যে দুর্বলতা আছে যেখানে শাস্তি কম সেখানে শাস্তি আরও বাড়াতে হবে। বিশেষ আইন করে বিচার করা যেমন নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে যেটি করা হয় সেটি করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অপরাধীরা যে অপরাধ করেছে সেই অনুযায়ী তার যথাযথ শাস্তি হচ্ছে না বা সেই মামলাটা আদালতে দুর্বল করে উপস্থাপন করা হলে এবং আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের হয়ে আসে। ফলে সে প্রকৃত সাজা ভোগ করার পরিবর্তে আরও অপরাধ পরিচালনায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তারা যদি যথাযথ আইনের প্রয়োগ করতে না পারে কোনো কিছুই কার্যকর হয় না। এই ধরনের অপরাধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এবং অপরাধী কেন সৃষ্টি হয়, আইনের ব্যত্যয় বা যে বা যারা অপরাধী তৈরি করে তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।
এদিকে রাজধানীসহ সারা দেশে চাঁদাবাজ, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, অনলাইন জুয়া চক্রসহ বিভিন্ন অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলমান সাঁড়াশি অভিযান সম্প্রতি জোরদার করা হয়েছে। মাদক অধিদপ্তর ও যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে সকল মেট্রোপলিটন এলাকায় চলছে বিশেষ অভিযান। ডিবির সাদা পোশাকের সদস্য, সাইবার মনিটরিং টিম এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। অনলাইন জুয়া, প্রতারণা ও সংগঠিত অপরাধে প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি চলছে বিশেষ ঝটিকা অভিযান। পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, গত ১ মে থেকে দেশব্যাপী শুরু হওয়া চলমান বিশেষ অভিযানে ১৮ হাজার ৩২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ অভিযান, ব্লক রেইড, গোয়েন্দা নজরদারি ও সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। সন্দেহভাজনদের যাচাই শেষে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত বিচারে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, মাদক ও অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় দেশব্যাপী যে সাঁড়াশি অভিযান চলমান রয়েছে তা পুলিশ সদর দপ্তর এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। পুলিশ সদর দপ্তর মনে করে, মাদক নির্মূল করতে না পারলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।