ছবি: সংগৃহীত
ড. আব্দুল মঈন খান। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। সাবেক মন্ত্রী। বিশ্বব্যাপী নন্দিত একজন অ্যাকাডেমিশিয়ান। নরসিংদী-২ আসনের পাঁচ পাঁচবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্যও তিনি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি জোট গঠিত মন্ত্রিসভায় তার নাম না দেখে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার অথবা রাষ্ট্রপতি হবেন তিনি। কিন্তু তাকে দেওয়া হয়েছে জাতীয় সংসদের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ। গত ১০ জুন এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এমন একজন প্রাজ্ঞ ও বিচক্ষণ সিনিয়র নেতাকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দেখে বিস্মিত হয়েছেন রাজনীতি সচেতন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে বিএনপির অবশিষ্ট সিনিয়র নেতাদেরকে নিয়ে। তাহলে কি ‘টিম তারেক রহমানে’ স্থান হচ্ছে না বিএনপির সিনিয়র নেতাদের? এমন একটি প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, ভঙ্গুর অর্থনীতির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশকে কি টেনে তুলতে পারবে অনভিজ্ঞদের নিয়ে গড়ে তোলা তারেক রহমানের এই টিম?
১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার পর তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের ১৮০ দিনের একটি ডেডলাইন দিয়েছেন। এর মধ্যে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। প্রণিধানযোগ্য কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। কিন্তু এই ১৮০ দিনই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে মন্ত্রিসভার নবীন সদস্যদের। কারণ মন্ত্রণালয়ের আমলা-সচিবদের বাইরে গিয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সিদ্ধান্তই দিতে পারছেন না মন্ত্রিসভার অনভিজ্ঞ অনেক সদস্য।
আবার এ-ও বলা হচ্ছে, তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ যে দুয়েকজনকে স্থান দেওয়া হয়েছে, তারা অনেকেই বয়সের ভারে এতই ন্যুব্জ যে, অনেকে অনেক কথা মনেই রাখতে পারেন না। বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা দায়িত্ব পেয়েছেন, যারা কে কোন কাজ করবেন তা-ই ঠিক করতে পারছেন না। এই মন্ত্রিদের মন্ত্রণালয়ে-আসা যাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই।
এমন অবস্থায় ড. মঈন খানের মতো জাদরেল ও অভিজ্ঞ নেতার স্থান যদি ‘ঢাল তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দার’ সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে হয় তাহলে অন্যদের কী হবে? বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের মধ্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এখনও কোনো দায়িত্ব পাননি। তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর বিষয়ে গুঞ্জন থাকলেও এটি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যায়নি। দলের একটি বড় অংশ রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে রেখেই সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পক্ষে মত দেওয়ায় তার অভিশংসনের বিষয়টি আর সামনে আসছে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারও বয়সের ভারে ন্যুব্জ। এ কারণে তিনি এবার সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি। তার আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তার ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ নেতাও স্থান পেয়েছেন মন্ত্রিসভায়। কিন্তু নওশাদ জমিরকে এখন পর্যন্ত কোনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য মির্জা আব্বাসকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে। মন্ত্রী পদমর্যাদার রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হলেও রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে তার অবস্থান তার রাজনৈতিক অনেক কর্মীর চেয়ে নিচে। একই অবস্থা স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খানেরও। তিনিও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার পাশাপাশি কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। তবে শারীরিকভাবে অসুস্থ হওয়ায় তার কর্মকাণ্ডও দৃশ্যমান নয়।
বিএনপির রাজনীতিতে সবচেয়ে পুরনোদের একজন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য। ‘টিম তারেক রহমানে’ এখনও তার স্থান হয়নি। দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্প্রতি ড. মঈন খানকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার ঘটনায় বিস্মিত হয়েছেন। সহযোদ্ধাদের অনেকেই তাকে জানিয়েছেন, তাকেও সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হতে পারে। ঘরোয়া সে আলোচনায় তিনি জানিয়েছেন, সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হলে তিনি সে দায়িত্ব নেবেন না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমানকে এবার সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তবে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি সংরক্ষিত আসনের সদস্য হিসেবে সংসদে যোগ দিয়েছেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য হওয়ায় ট্রেজারি বেঞ্চের প্রথম সারিতেই স্থান পেয়েছেন তিনি। ‘টিম তারেক রহমানে’ তার স্থান হবে কি না সেটা অনেকটাই অনিশ্চিত।
ড. মঈন খানকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ায় সিনিয়র নেতাদের মধ্যে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা, বঞ্চনার সময় আরও প্রলম্বিত হতে পারে। কারণ, সংসদীয় কমিটি মূলত একটি ওয়াচডগ কমিটি। এই কমিটি প্রতি মাসে একটি মিটিং করতে পারে এবং মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দিতে পারে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে সুপারিশ করতে পারে। যে সুপারিশগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
এদিকে জাতীয় সংসদের সাবেক হুইপ ও বরিশালের সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ার তার বঞ্চনার বিষয়ে মুখ খুলেছেন। বরিশাল-৬ আসনের পাঁচবারের এই সংসদ সদস্য প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপকালে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তারেক রহমানের টিমে আমাদের মতো সিনিয়র নেতারা না থাকলে সেই টিম কতটা কার্যকর হবে? ... আমি ৫ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। জেলজুলুমে অবিচল থেকে দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছি। তারপরও মূল্যায়িত হলাম না। আমাদের তাহলে কোথায় রাখা হবে?’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, ‘এক পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না শুনে আমি নির্বাচনই করতে চাইনি। দলীয় মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। শুরু থেকেই আমি দলের সঙ্গে আছি। সকল আন্দোলন সংগ্রামের অগ্রভাগে থেকেছি। দলকে সংগঠিত করতে দায়িত্ব পালন করেছি। ম্যাডাম বেঁচে থাকলে আমাদের এমনভাবে বঞ্চিত করা যেত না।’ তিনি প্রশ্ন করেন, ‘মির্জা আব্বাসকে উপদেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তার রাষ্ট্রীয় প্রটোকল এ্যানিরও নিচে। এটা কীভাবে হয়?’ তবে যাই ঘটুক না কেন, শহীদ জিয়ার আদর্শে অবিচল থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিএনপিই আমাদের শেষ ঠিকানা। যেভাবে আছি, তাতেই আমি খুশি।’
সম্পাদনা : ইমতিয়ার, শব্দ : ৭৮৮