চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: বাসস
একদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আগ্রহ ও কূটনৈতিক চাপ। বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে শ্রমিক-কর্মচারীদের অনড় অবস্থান। অন্যদিকে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশি রাজস্ব প্রদানের প্রস্তাবÑ এই দুই বাস্তবতার মাঝে দাঁড়িয়ে সরকারের সামনে বড় সিদ্ধান্তের প্রশ্নÑ কোন পথে যাবে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) অপারেটর নিয়োগ? জিটুজি চুক্তির আওতায় আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাবে নাকি তাদের স্থলে নিয়োগ দেওয়া হবে দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বন্দর সংশ্লিষ্টদের মনে।
সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক চিঠি ঘিরে এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। গত ৪ জুন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক চিঠিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে সে ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বাতিল করার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ প্রদান করা হয় বন্দর কর্তৃপক্ষকে। যদিও এর তিন ঘণ্টা পর আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
কার হাতে যাবে এনসিটি এই সিদ্ধান্তের বিষয়টি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করলেও বন্দরের অধিকাংশ কর্মকর্তা চাইছেন যেই প্রতিষ্ঠানকে দিলে বন্দরের স্বার্থ ঠিক থাকবে, বেশি রাজস্ব পাওয়া যাবে তাদের হাতেই যাক কন্টেইনার টার্মিনালটির অপারেশন কার্যক্রমের ভার। তাদের বক্তব্য পরিচালনায় কে এলো, আর কে গেল সেটি দেখার বিষয় না। মুখ্য বিষয় হচ্ছে, যাদের দিলে বন্দরের রাজস্ব আয় বেশি হবে এবং বন্দরের স্বার্থ ঠিক থাকবে তাদেরই নিয়োগ দেওয়া হোক।
বন্দর পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশি অথবা বিদেশি সেটি বিষয় না। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে অপারেটর নিয়োগ দিতে হবে। যার ইপিসিয়েন্সি বেশি তাকে দিতে হবে, অদক্ষ কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।’
বন্দর কর্তৃপক্ষ যেই সিদ্ধান্তই নিক। তাদেরকে পড়তে হবে বেকায়দায়। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দিতে গেলে মোকাবিলা করতে হবে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন সংগ্রাম। অন্যদিকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে নেগোসিয়েশন বাতিল করে দেশীয় অপারেটর নিয়োগ দিলে হুমকির মুখে পড়বে আরব আমিরাতের শ্রমবাজার ও ওই দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক।
লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণের নামে দেশের ডলার সংকট কাটাতে তৎকালীন শেখ হাসিনার সরকার সংযুক্ত আমিরাতকে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনালসহ বন্দর খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে সরকার টু সরকার (জি টু জি) ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও বাংলাদেশ সরকারের পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ডিপি ওয়ার্ল্ড বে-টার্মিনাল ও এনসিটি টার্মিনালে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। তবে দীর্ঘ সময় আলোচনায় তেমন অগ্রগতি হয়নি। এরপর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিষয়টি আবারও সামনে আসে। তখন জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতে গ্রেপ্তার বাংলাদেশি শ্রমিকদের মুক্তির বিষয়টি নিয়ে উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের সময় ডিপি ওয়ার্ল্ডের এনসিটি আগ্রহও নতুন করে গুরুত্ব পায়।
বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও সিইও সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে বৈঠকের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ডিপি ওয়ার্ল্ড তাদের আগের এমওইউ ও এনসিটি পরিচালনায় আগ্রহের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেয়। পাশাপাশি দুবাইয়ের বিশাল শ্রমবাজার ও সেখানে অবস্থানরত প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকের প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। এরপর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে আসার পর এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামে শ্রমিক-কর্মচারীরা। তাদের লাগাতার আন্দোলন-সংগ্রামে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর থেকে পিছু হটে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর নির্বাচনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বাংলাদেশ-দুবাই জয়েন্ট পিপিপি প্লাটফর্ম সভায় এনসিটি নিয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে যায়। ওই সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ড কনসেশন চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করার অনুরোধ জানায়। একই সঙ্গে তারা এনসিটির পাশাপাশি চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার আগ্রহও প্রকাশ করে। এরপর গত ৪ জুন এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগ নিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি চিঠি ইস্যু করার ঘটনায় বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে আসে।
এনসিটিতে অপারেটর নিয়োগ নিয়ে ডিপি ওয়াল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সময় টার্মিনালটি পরিচালানর জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দুটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। গত ২৮ এপ্রিল এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয় দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ। একই দিন বিএনপিদলীয় দুই সংসদ সদস্যের মালিকানাধীন দুই প্রতিষ্ঠানসহ তিনটি প্রতিষ্ঠানের একটি কনসোর্টিয়াম এনসিটির দায়িত্ব পেতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দেয়। এই দুটি প্রস্তাবে ডিপি ওয়াল্ডের চেয়ে বেশি রাজস্ব প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে অপারেটর নিয়োগে লাভক্ষতির বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। দেশীয় দুটি প্রস্তাবেই রাজস্ব বেশি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিন প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতি টিইইউ ৬৯ ডলার পরিশোধের পাশাপাশি অপারেশন, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং জনবল ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তারা বহন করবে। ফলে আগামী ১৫ বছরে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কোনো মূলধনি বা পরিচালন ব্যয় বহন করতে হবে না। অন্যদিকে এমজিএইচ গ্রুপের দাবি, তারা ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় প্রতি টিইইউ কন্টেইনারে গড়ে ৫ ডলার বেশি রাজস্ব বন্দরকে দিতে পারবে। আগাম কনসেশন ফি হিসেবেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের ২ কোটি ডলারের বিপরীতে ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমজিএইচের হিসাব অনুযায়ী, তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে ১৫ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ১ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব পেতে পারে।
বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রস্তাব আসায় এখন প্রশ্ন উঠেছে এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে কোন পথে হাঁটছে বন্দর।
চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মোবাইল রিসিভ করেননি। পরে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাসির উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কার হাতে তুলে দেওয়া হবে এনসিটির দায়িত্ব এটি মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় আমাদেরকে যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছে সেই অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। মন্ত্রণালয় থেকে সর্বশেষ চিঠি পাওয়ার পর নতুন নেগোসিয়েশন কমিটি করার জন্য আমরা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয় থেকে কোনো আপডেট পাইনি।