ইন্টারপোলের রেড নোটিস
২৪ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন এখনও ঝুলে আছে ইন্টারপোলে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন এখনও ঝুলে আছে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে মোট ২৯ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৫ জনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে রেড নোটিস জারি করেছে সংস্থাটি; যাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদসহ চারজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অ্যাডিশনাল আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম রবিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের কাছে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে। এই আবেদনের ওপর নানা যাচাই-বাছাই শেষে যৌক্তিক মনে হলে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করে। বিষয়টি সম্পূর্ণ তাদের এখতিয়ার। তারা আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখতে যথেষ্ট সময় নিয়ে থাকে।’
যাদের বিরুদ্ধে আবেদন ঝুলে আছে
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রেড নোটিস জারির আবেদনের তালিকায় রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা। প্রতিদিনের বাংলাদেশ ২৪ জনের মধ্যে ২১ জনের নাম জানতে পেরেছে। তারা হলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ও ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, হাসিনা সরকারের সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, আ ক ম মোজাম্মেল হক, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত।
এ ছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ে গাফিলতি ও দীর্ঘদিন বিদেশে অবস্থানের অভিযোগে টিএনজেড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহাদাৎ হোসেন শামীম, ডার্ড গ্রুপের চেয়ারম্যান ইত্তেমাদ উদ দৌলা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাবিল উদ দৌলার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারির আবেদন করা হয়েছে। রোর ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুল ইসলাম ও উজ্জ্বল হায়দারের বিরুদ্ধেও আবেদন করা হয়েছে।
ব্যাংকের বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম, পরিচালক আবু সামাদ ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ হাসানের বিরুদ্ধেও ইন্টারপোলে আবেদন করেছে পুলিশ। এ ছাড়া হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় পলাতক জেবুন্নেসা আকতারের বিরুদ্ধেও আবেদন করা হয়েছে।
রেড নোটিস জারি ও গ্রেপ্তার
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেছেন, এ পর্যন্ত ২৯ জনের বিরুদ্ধে আবেদন করা হলেও বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে রেড নোটিস ইস্যু করা হয়েছে। এই পাঁচজনের নোটিস ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে প্রকাশ না করা হলেও সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জানানো হয়েছে।
এদের মধ্যে বেনজীর আহমেদসহ চারজনকে ইতোমধ্যে ইন্টারপোল গ্রেপ্তার করেছে। স্ত্রী হত্যার অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় পলাতক আওলাদ হোসেন এখনও গ্রেপ্তার হননি। এর আগে নরসিংদীর শিবপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুনুর রশিদ হত্যা মামলার পলাতক আসামি আরিফ সরকারকে দুবাই থেকে ইন্টারপোলের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে এনেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন হাবিব খান ও মহসিন মিয়া।
যেভাবে কাজ করে ইন্টারপোল
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি, বিশেষ করে খুন, মানব পাচার, অর্থ পাচার ও দুর্নীতির মতো অপরাধীদের ক্ষেত্রে ইন্টারপোল রেড নোটিস ইস্যু করে। তবে রাজনৈতিক, সামরিক বা বর্ণগত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় তারা সাধারণত নোটিস ইস্যু করে না। ইস্যুর আগে তারা দেখে যে মামলাটি রাজনৈতিক কি না, যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ আছে কি না এবং তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে কি না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিস জারি করতে পুলিশের মাধ্যমে ইন্টারপোলকে অনুরোধ করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে হাসিনাকে ফেরত পেতে অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছে। বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরত দিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিক অনুরোধও জানানো হয়। তবে এসব চিঠির বিষয়ে ভারত সরকার এখনও স্পষ্ট কোনো জবাব দেয়নি।