মেরিনা লাভলী, রংপুর, কৃষ্ণ ব্যানার্জী, সাতক্ষীরা, প্লাবন শুভ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) ও আবু সাঈদ, বাঘা (রাজশাহী)
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
রংপুর নগরীর বাস টার্মিনাল এলাকায় জমজমাট আমের আড়ত। প্রবা ফটো
সারা দেশে আমের বাজার পুরোপুরি জমে উঠেছে। উত্তরের জেলা রংপুরে সুস্বাদু হাঁড়িভাঙা আমের রমরমা ফলনে কৃষকের মুখে চওড়া হাসি। উচ্চ বিমানভাড়ার মতো বাধা পেরিয়ে ফ্রান্সে উড়াল দিচ্ছে রাজশাহীর বিখ্যাত হিমসাগর ও আম্রপালি। পিছিয়ে নেই দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরাও; এখানকার বিষমুক্ত আম যাচ্ছে ইউরোপের বাজারে। সব মিলিয়ে দেশে এখন চলছে আমের বিশাল অর্থনৈতিক মহোৎসব।
হাঁড়িভাঙায় পাল্টে যাচ্ছে রংপুরের অর্থনীতি : আমের বাজারে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে হাঁড়িভাঙার জেলা হিসেবে পরিচিত রংপুর। রংপুরের বাজারগুলোতে নানা স্বাদ, আকৃতি ও রঙের আমের পসরা বসলেও ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ মিষ্টি ও আঁশহীন হাঁড়িভাঙা। উৎপাদন মৌসুম হওয়ায় বাজারে সরবরাহ ব্যাপক, তাই দামও ক্রেতাদের বেশ নাগালেই। রংপুর নগরের টার্মিনাল, সিটি বাজার, ডিসির মোড় ও শাপলা চত্বর ঘুরে দেখা যায়, আকারভেদে প্রতি কেজি হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়।
হাঁড়িভাঙার ব্যাপক বিস্তারে কৃষকদের ভাগ্যও বদলে যাচ্ছে। শুধু রংপুরেই নয়; পাশের জেলা দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জেও এই আমের চাষ বেড়েছে। ফুলবাড়ীর বুজরুক সমশেরনগর গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেছেন, ‘ধান চাষ আর আম চাষে লাভের পার্থক্য এখন আকাশ-পাতাল।’ রংপুরের পদাগঞ্জ হাটের বিক্রেতা তুহিন মিয়া জানান, হাঁড়িভাঙার পাশাপাশি ব্যানানা ম্যাংগোর বাগান করেছেন তিনি, যার এক মৌসুমের আম বিক্রির টাকা দিয়েই তাদের সারা বছর স্বাচ্ছন্দ্যে চলে যায়।
এ বিষয়ে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ধান ও পাটের চেয়ে আমে শ্রম কম এবং লাভ বেশি হওয়ায় বাগানের পরিধি দিন দিন বাড়ছে। কৃষকেরা এখন হাঁড়িভাঙার পাশাপাশি অন্যান্য সুস্বাদু আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কোনোভাবেই যেন অপরিপক্ব আম বাজারে না আসে, সে লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
অন্যদিকে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘উপজেলায় ৪৬০ হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ রয়েছে। এ বছর শুধু ফুলবাড়ীতেই ১৪ থেকে ১৫ কোটি টাকার আম বেচাকেনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
ফ্রান্সে বাঘার হিমসাগর ও আম্রপালি : রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো ফ্রান্সে আম রপ্তানি শুরু হয়েছে। গত সোমবার প্রথম চালানে মোট ৫৫০ কেজি হিমসাগর ও আম্রপালি আম ফ্রান্সে পাঠানো হয়েছে। উচ্চ উড়োজাহাজ ভাড়া ও আন্তর্জাতিক নানা সংকটের কারণে এবার আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও, এই উদ্যোগ স্থানীয় অর্থনীতি ও আমচাষিদের জন্য বড় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাঘার ‘সাদি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েক বছর ধরেই বিদেশে আম রপ্তানি করে আসছে। গত বছর বিরতি থাকলেও এবার আবার তারা রপ্তানি শুরু করেছে।
চলতি মৌসুমে বাঘা থেকে ২০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সন্দিহান রপ্তানিকারক শফিকুল ইসলাম সানা। তিনি এই প্রতিবেদককে বলেছেন, বর্তমানে আম রপ্তানিতে দুটি বড় বাধা রয়েছে। প্রথমত, উড়োজাহাজের অস্বাভাবিক বেশি ভাড়া; দ্বিতীয়ত, দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান অস্থিরতা। আন্তর্জাতিক এই সংকটের কারণে বিদেশে আম পাঠানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লাহ সুলতান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘উত্তম কৃষিচর্চার মাধ্যমে উৎপাদিত বাঘার নিরাপদ আম এর আগেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করেছেন শফিকুল ইসলাম সানা। গত বছর রপ্তানি বন্ধ থাকলেও চলতি মৌসুমে তার মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো বাঘা থেকে ফ্রান্সে আম পাঠানো হলো। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে রপ্তানিকারক ও চাষিদের নিরাপদ আম উৎপাদনে সব ধরনের সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’
সাতক্ষীরার আম ইউরোপে : দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা সাতক্ষীরায় চলতি মৌসুমে আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার আম ১২তম বারের মতো ইউরোপের বাজারে যাচ্ছে। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে মৌসুম আগেভাগেই শেষ হতে চলায় সাতক্ষীরার বাজারগুলোতে এখন একক রাজত্ব করছে আম্রপালি।
ঈদের ছুটিতে বাজার বন্ধ থাকা ও অতিরিক্ত গরমে আম পেকে যাওয়ায় কিছু ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ব্যবসায়ী নুর আলী জানান, ২৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এ পর্যন্ত মাত্র ২০ লাখ টাকা তুলতে পেরেছেন তিনি।
তবে সামগ্রিক বাণিজ্যের চিত্র বেশ আশাব্যঞ্জক। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, এ বছর ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমির বাগানে আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার ৩৮০ মেট্রিক টন। তিনি বলেন, ‘জেলায় ১২ হাজার ৫০০ জনের বেশি নিবন্ধিত আমচাষি রয়েছে। তাদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপদ আম উৎপাদন ও প্যাকেজিং করা হচ্ছে। চলতি বছর সাতক্ষীরা থেকে ১০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও ইতোমধ্যে ৮৬ টন পাঠানো হয়েছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার মিলিয়ে চলতি মৌসুমে জেলায় ৪০০ কোটি টাকার বেশি আম বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছি আমরা।’