পুঁজিবাজার সংস্কার এবং বিকল্প অর্থায়নের খাতগুলো শক্তিশালী করার বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকঋণের ওপর একক ও অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে পুঁজিবাজার সংস্কার এবং বিকল্প অর্থায়নের খাতগুলো শক্তিশালী করার বিশেষ পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে টেকসই ও আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কৌশল হিসেবে এই কাঠামোগত পরিবর্তনের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সরকারের এই নীতিগত অবস্থানের কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এবারের বাজেটে করপোরেট বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড, গ্রিন বন্ড এবং সুকুকের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমগুলোকে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, দেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন অবিকশিত থাকায় এটি দীর্ঘমেয়াদি মূলধন জোগানে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের উদ্যোক্তাদের পুঁজির জন্য প্রায় সম্পূর্ণভাবে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই ঋণের বোঝা কমাতে বিনিয়োগের মূল উৎস হিসেবে ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিং এবং পুঁজিবাজারের বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারগুলোর কার্যক্রম ও নগর অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থায়নের জন্য প্রথমবারের মতো ‘মিউনিসিপ্যাল বন্ড’ ছাড়ার একটি আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে।
শেয়ারবাজারে সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাজার পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়াতে লিস্টিং বা তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে তা সহজ করা হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর এবং সময়াবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার অধীনে আবেদন, অনুমোদন এবং তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত সব কার্যক্রম একটি সমন্বিত অনলাইন প্লাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া যোগ্য ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তি বা ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের সম্ভাবনাও যাচাই করছে সরকার।
বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির মতো বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে পেশাদার তহবিল ব্যবস্থাপনা যেমন সম্প্রসারিত হবে, তেমনি সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তর সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের প্রথম কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালু করা এবং আবাসন খাতের জন্য রিয়েল এস্টেট ইনভেস্টমেন্ট ট্রাস্ট (রিট), এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড ও হেজিংয়ের মতো নতুন আর্থিক সেবা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে বাজেটে।
এছাড়া বাজার-সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করার পাশাপাশি তথ্য প্রকাশের মান, নিরীক্ষা ব্যবস্থা, ক্রেডিট রেটিং এবং গবেষণার মানোন্নয়নে প্রস্তাবিত বাজেটে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সরকার আশা করছে, এই সামগ্রিক সংস্কারের ফলে পুঁজিবাজার শিল্প, অবকাঠামো ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের একটি শক্তিশালী উৎসে পরিণত হবে। এটি একদিকে যেমন ব্যাংক খাতের ওপর থেকে অতিরিক্ত ঋণের চাপ কমাতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখবে।