আবু কাওসার
প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে
বাজেট ঘোষণা করবেন নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
২০২৪ সালের পাঁচই আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার সকল অনিশ্চয়তাকে পিছে ফেলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি সম্পন্ন করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর পর সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপি।
শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই নির্বাচিত নতুন সরকারের কাছে স্বভাবতই জনগণের প্রত্যাশা অনেক। এমন প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করতে চলেছে নতুন বিএনপি সরকার।
নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন একসময়ে বাজেট ঘোষণা করছেন যখন দেশে ও বৈশ্বিক পরিসরে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন পরাশক্তি জড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও যুদ্ধে।
ফলে বিশ্ব-অর্থনীতিতে নতুন মেরুকরণের বাস্তবতায় অর্থমন্ত্রী জনগণের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ করতে পারবেন, তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। একদিকে দেশের অর্থনৈতিক মন্দা, অন্যদিকে বৈশ্বিক সংকটÑ এমন দ্বিমুখী চাপের মধ্যে অর্থমন্ত্রীর উপস্থাপিত বাজেট সবাইকে কতটুকু খুশি করতে পারবেন, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে কৌতূহল ও সংশয়।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ও চৌকস ব্যবসায়ী। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর। অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম বাজেট।
চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির এই প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা এর আগে জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পরিচালনার ভার প্রথমবারের মতো তার কাঁধে এসে পড়েছে। দায়িত্ব পাওয়ার সাড়ে তিন মাসের মাথায় জাতীয় বাজেট দিতে হচ্ছে তাকে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার প্রথম পরীক্ষা। সকল চাপ সামলে তিনি এই বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে বাজেটে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন, তা জানা যাবে আজই।
তবে এতে কোনো সংশয় নেই যে, অর্থমন্ত্রীর সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, স্থবির বিনিয়োগ চাঙ্গার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জ্বালানি সংকট থেকে উত্তরণ ও রাজস্ব আদায় বাড়ানো। এসব চ্যালেঞ্জ তিনি কীভাবে মোকাবিলা করবেন, তা জানার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন দেশবাসী।
অর্থমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, দেশের মানুষের কথা বিবেচনা করেই বাজেট দিচ্ছেন তিনি। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তার দপ্তরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন তিনি।
আজ বেলা ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে মন্ত্রিসভায় নতুন বাজেট অনুমোদন হবে। বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মিশনের কূটনীতিক, রাষ্ট্রদূত ও সংবাদকর্মীরা এ সময় উপস্থিত থাকবেন।
অনেকেরই ধারণা ছিল, এই সংকটময় সময়ে অর্থমন্ত্রী একটি সাশ্রয়ী বাজেট দেবেন। কিন্তু সে পথে না হেঁটে বিশাল ব্যয়ের পরিকল্পনা করছেন তিনি। বিশাল এ ব্যয় মেটাতে জনগণের ওপর ‘বাড়তি’ কর ও ভ্যাটের বোঝা চাপানোর কৌশল নিচ্ছেন তিনি।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি।
অতীত নিকটে বাংলাদেশে বাজেটের আকার বেড়েছে আগের বছরের তুলনায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু এবারের বাজেটে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। ফলে প্রস্তাবিত বাজেটের বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অতি উচ্চাভিলাষী এই বাজেট অর্থায়নে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে এবার অনেক বেশি ঋণনির্ভর হতে হবে সরকারকে।
উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। পরে তা সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, ৩০ জুন অর্থবছর শেষে প্রকৃত খরচ হবে ৭ লাখ কোটি টাকা।
বড় বাজেট দেওয়ার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী
তবে আগামী অর্থবছরে বড় বাজেট দেওয়ার যুক্তি হিসেবে অর্থমন্ত্রী বলছেন, “দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি সংস্কারে সময়ের প্রয়োজন। কারণ, ব্যয় বৃদ্ধির দরকার। অর্থনীতি যে জায়গায় আছে, একে ওপরের দিকে নিয়ে না গেলে চলবে না।”
সম্প্রতি ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে আগামী অর্থবছরের বাজেটের ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই আয়োজিত পরামর্শক কমিটির বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বড় বাজেটের দিকে নজর বেশি না দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য ও গুণগত মানসম্পন্ন বাজেট করতে হবে।”
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হচ্ছে বাজেট। এতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।”
ঘাটতি অর্থায়ন
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাংকঋণ, সঞ্চয়পত্রসহ ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে আসবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে আসবে ১৫ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ হিসেবে আসবে ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর বাইরে অনুদান নেওয়া হবে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
জিডিপি ও মূল্যস্ফীতি
নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে সাড়ে ৬ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার বেড়ে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছবে। চলতি বাজেটে এ লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
বাজেটে যা থাকছে
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে, নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে। বর্তমানে বরাদ্দ আছে ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এটি বাড়িয়ে ৬৯ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করা হচ্ছে। অর্থাৎ দ্বিগুণ বরাদ্দ থাকছে। অতীত নিকটে স্বাস্থ্যে এত বেশি বরাদ্দ দেখা যায়নি। পাশাপাশি শিক্ষায় নজর দেওয়া হচ্ছে। এই খাতে বরাদ্দ ৯৭ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা করা হচ্ছে। ৪০ শতাংশের বেশি বাড়ানো হচ্ছে।নজর দেওয়া হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের আওতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে। এ খাতে বরাদ্দ থাকছে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা, যা এ যাবৎ কালের মধ্যে সর্বোচ্চ। তরুণদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে, যেমন: সফটওয়্যার, ভিডিও গেমস, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য ইত্যাদি কাজে উৎসাহিত করতে নতুন এক ধারণা ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’র ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। এ জন্যে বরাদ্দ থাকছে ৩০০ কোটি টাকা। সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রত্যাশিত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকছে। নতুন অর্থবছরে পহেলা জুলাই থেকে এটি আংশিক কার্যকর হবে। এজন্য ‘বাড়তি’ ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
কর প্রস্তাব
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, পণ্য-সেবায় কর এবং ভ্যাটের হার বাড়িয়ে, আমদানি করা কিছু পণ্যে শুল্ক বাড়িয়ে ‘বাড়তি’ রাজস্ব আদায় করা হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও থাকছে। আবার স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষায় প্রণোদনা সুবিধা অব্যাহতও রাখা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কর আহরণ বাড়াতে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, তৃণমূল পর্যায়ে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের প্রস্তাব থাকছে। এ ছাড়া করদাতার সংখ্যা বাড়াতে ব্যাংক হিসাব খুলতে ট্যাক্সপেয়ার আইডেনটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।
এনবিআর সূত্র বলেছে, এই কর প্রস্তাব কার্যকর হলে আগামী এক বছরের মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ লোককে নতুন করে করের আওতায় আনা সম্ভব হবে। যাদের ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি আমানত জমা আছে, তাদের ওপর আবগারি শুল্ক বাড়ছে। দামি মোটরসাইকেল করের আওতায় আনা হচ্ছে। এ ছাড়া গৃহস্থালি সামগ্রী, ইন্টারনেট সেবা, আসবাবপত্র ও এমএস রডের শুল্ক-কর বাড়ছে। আবার নির্মাণসেবায় ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাব থাকছে। এসব কর প্রস্তাব কার্যকর হলে সাধারণ জনগণের জীবনযাপন আরও কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এসব কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি বিনিয়োগ চাঙ্গা ও ব্যবসা-বান্ধব নীতির বিষয়ে ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর কমানো হচ্ছে। রপ্তানি প্রণোদনার অর্থের ওপর বর্তমানে বিভিন্ন হারে উৎসে কর কাটা হয়। আগামী অর্থবছরে ১০ শতাংশ উৎসে কর কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।
ঘোষণা আসতে পারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয় করমুক্ত রাখার। বর্তমানে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।
এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সারদের আয়ও করমুক্ত রাখার ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে বাজেটে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ খাতে বড় ধরনের কর সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে প্রস্তাবিত বাজেটে।
এ ছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের টার্নওভার করের ক্ষেত্রে করমুক্ত সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হতে পারে।