কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও ওই পাঁচ জ্যেষ্ঠ পাইলটের বিরুদ্ধে তদন্তের কোনো চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাঁচ জ্যেষ্ঠ পাইলটের বিরুদ্ধে প্রায় তিন দশকের পুরনো প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স-সংক্রান্ত জাল নথি বা প্রশ্নবিদ্ধ সনদ ব্যবহার করে ফ্লাইট পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একটি বেনামি অভিযোগের সূত্র ধরে বিষয়টি সামনে আসার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এবং বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) এ বিষয়ে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তদন্তের কোনো চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি।
অভিযুক্ত পাঁচ পাইলট হলেন- বিমান পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সভাপতি ক্যাপ্টেন আবদুল বাছিত মাহতাব, ক্যাপ্টেন আবদুর রহমান, ক্যাপ্টেন আনিস আহমেদ, ক্যাপ্টেন ইউসুফ মাহমুদ এবং ক্যাপ্টেন ফারিয়াল বিলকিস।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় সম্প্রতি তদন্ত শুরু হলেও ঘটনাটি প্রায় ৩২ বছর আগের। যে কারণে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি রেকর্ড অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে তদন্ত কার্যক্রম ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
বেনামি ই-মেইল থেকে তদন্তের সূচনা সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একাউন্টে একটি বেনামি ই-মেইল আসে। সেখানে পাঁচ পাইলটের লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ সনদ এবং উড়ানঘণ্টা (ফ্লাইং আওয়ার) সংক্রান্ত নানা অসঙ্গতির অভিযোগ তোলা
হয়।
এসব নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশে প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। মন্ত্রণালয় তখন অভিযোগটি আমলে নিয়ে তা তদন্তের নির্দেশ দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে বিমান কর্তৃপক্ষের সুপারিশের ভিত্তিতে বেবিচকও পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে।
১৯৯৩ সালের নথি যাচাইয়ে জটিলতা তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত পাইলটরা ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন করে পেশাগত সনদ অর্জন করেন বলে তথ্য প্রদান করেন। ওই সময়ের অনেক নথিই ডিজিটাল আকারে সংরক্ষণ করা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তারা এমন কিছু নথি যাচাই করছেন যেগুলোর বয়স ৩০ বছরেরও বেশি। অনেক রেকর্ড সংরক্ষণাগারে নেই, কিছু বিদেশি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তথ্যও সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তাই তদন্ত দ্রুত শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আধুনিক উড়োজাহাজ পরিচালনায় অভিযুক্ত পাইলটরা
অভিযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এই কারণে যে অভিযুক্তদের বেশিরভাগই দীর্ঘদিন ধরে বিমান বাংলাদেশের বহরে থাকা আধুনিক উড়োজাহাজ পরিচালনা করে আসছেন। তারা বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ড্রিমলাইনারের মতো অত্যাধুনিক উড়োজাহাজের ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব উড়োজাহাজে আন্তর্জাতিক রুটে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন করা হয়। তবে সূত্রগুলো এ-ও জানাচ্ছে, এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত পাইলটদের বিরুদ্ধে কোনো উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা, নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি বা পেশাগত অদক্ষতার অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগটি মূলত নথির বৈধতা নিয়ে।
তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন: বিমান ও বেবিচক দুই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তদন্ত কমিটিগুলো নিয়মিত কাজ করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। কয়েক মাস ধরে চলা তদন্তের পরও চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের কাজ এগোচ্ছে, কিন্তু গতি খুব ধীর। অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় দ্রুত সিদ্ধান্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে যে গতিতে তদন্ত চলছে, তাতে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত নন তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা। তাদের মতে, তথ্য-প্রমাণ যাচাই না করে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম বলেন, “মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তদন্ত শেষ হলে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
তারা ষড়যন্ত্রের শিকার
এদিকে অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন অভিযুক্তদের অন্যতম এবং বাপা সভাপতি ক্যাপ্টেন আবদুল বাছিত মাহতাব।
তিনি বলেন, তারা একটি ষড়যন্ত্রকারী চক্রের টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। বেনামি অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগকারীরা নিজেদের পরিচয়ও দেননি।
তার দাবি, প্রায় তিন দশক আগে বৈধ প্রক্রিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলটদের বিরুদ্ধে হঠাৎ করে এমন অভিযোগ তোলার পেছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তারাও চান তদন্ত হোক এবং সত্য সামনে আসুক।