স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন। ফাইল ছবি
রাজধানীর মৌচাকে ফুটপাতের দখল ও চাঁদা তোলা নিয়ে রমনা থানা যুবদলের আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবু ও স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদারের ভাগ্নে আকাশের দ্বন্দ্ব চলছিল দীর্ঘদিন ধরে। আর সেই ভাগ্নের দ্বন্দ্ব মিটাতে গিয়ে সোমবার রাতে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বিল্লাল হোসেন। এ ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে এমন তথ্য পেয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা।
তদন্ত সূত্র বলছে, যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম ও তার অনুসারীরা রাত ৮টার দিকে মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনে বিল্লাল হোসেনের ভাগ্নে মোবারক হোসেনকে (আকাশ) মারধর করছিলেন। এমন খবর পেয়ে বিল্লাল হোসেন সেখানে যান এবং বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। সালিশ-বৈঠকের একপর্যায়ে দিদারুল ইসলামের সঙ্গে বিল্লালের কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিল্লালের বুকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পূর্ব পরিকল্পিত এ হামলায় ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল অংশ নেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মৌচাক-আনারকলি এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে পূর্বশত্রুতার বিষয়টিই প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। মূলত তাদের দ্বন্দ্বটা ছিল ফুটপাতের সীমানার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে। সেই দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে বসে বিষয়টি সংঘর্ষে রূপ নিলে সেখানে প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা বিল্লাল হোসেন তালুকদার। এ ছাড়া ঘটনার পেছনে আরও কী কী যুক্ত থাকতে পারে প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, নিহত বিল্লাল হোসেনের বাসা মালিবাগের বাগানবাড়ি এলাকায়। তার বাবার নাম মৃত ইউসুফ তালুকদার। তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। তার দুই স্ত্রী ও ছয় সন্তান রয়েছে। বিল্লাল রাজনীতির পাশাপাশি মালিবাগ এলাকায় রট-সিমেন্টের ব্যবসা করে আসছিলেন।
জানা গেছে, সোমবার রাত ৮টার দিকে মৌচাকের আনারকলি মার্কেটের সামনের গলিতে বিল্লালকে ছুরিকাঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাত ৯টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর রাতেই যুবদলের রমনা থানার আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে যুবদলের রমনা থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি। এই ঘটনায় রমনা থানা পুলিশ ঢাকার মগবাজার ও মুন্সীগঞ্জ থেকে আলামিন ও রিয়াজ নামে দুজনকে আটক করে। আটক রিয়াজ রমনা যুব দলের ওয়ার্ড কমিটির সদস্য ও আলামিন রমনা ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদলের আহ্বায়ক। এ ঘটনায় জড়িত বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ছাড়া এ ঘটনায় রমনা থানায় নিহতের স্ত্রী আম্বিয়া খাতুন হত্যা মামলা করেছেন বলে জানিয়েছে রমনা থানা পুলিশ। মামলায় দিদারুল ইসলাম বাবুকে প্রধান আসামি করে ২১ জনের নাম উল্লেখসহ আরও অজ্ঞাত আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে উল্লেখ রয়েছে বিদ্যুৎ বিল ও ময়লা বিলের নামে বাবু বিভিন্নজনের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতে। এ ছাড়া ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করত।
স্থানীয় সূত্র ও নিহতের পরিবারের দাবি, শুধু তাৎক্ষণিক কোনো মারধরের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব। নিহত বিল্লালের ভাগ্নে মোবারক হোসেন আকাশকে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, যুবদল নেতা দিদারুল ইসলামের নেতৃত্বে আমার মামার ওপর হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘একদল লোক আনারকলি মার্কেটের সামনের খাবারের দোকানগুলোতে চাঁদাবাজি করছিল। তখন আমি প্রতিবাদ করলে আমাকে আটকে রেখে মামাকে (বিল্লাল হোসেন) সেখানে যেতে বলে তারা। মামার সঙ্গে আমার ভাইসহ আরও কয়েকজন সেখানে যায়। দুপক্ষের মধ্যে কথা বলার একপর্যায়ে ছোরা বের করে আমাকে দুই দফায় হামলা করা হয়। সেই আক্রমণ আমার শরীরে লাগেনি। একপর্যায়ে পেছন থেকে এসে আমার মামার বুকে ছুরি মারে একজন।’
তার ভাষ্য, দিদার ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছিলেন। অবৈধভাবে চাঁদা তোলে আসছিলেন ওই এলাকা থেকে। তার মামা বিল্লাল হোসেন তালুকদার সিনিয়র রাজনীতিবিদ হওয়ায় মৌচাক-আনারকলি মার্কেটের আশেপাশে ফুটপাতের দোকানদারদের নিজেদের মধ্যকার যেকোনো ঝগড়া বা সমস্যা হলে তারা তার শরণাপন্ন হতেন। তিনিও এসব সমস্যার সালিশ-মীমাংসা করতেন। ফুটপাতে চাঁদাবাজির একক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম বাবু এই সালিশি প্রথা পছন্দ করতেন না এবং মামার ওপর তার চরম ক্ষোভ ছিল। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেই আমাদের ওপর হামলা চালায়।
বিভিন্ন সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মালিবাগে সোহাগ পরিবহনের কার্যালয় ও মালিকের বাসায় ভাঙচুরের একটি মামলায় দিদারুল ইসলামের ষড়যন্ত্রে বিল্লালকে আসামি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই মামলায় বিল্লাল তিন মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হন ও পরে সোহাগ পরিবহন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি মীমাংসা করে নেন। ঘটনার পর তার সাংগঠনিক বহিষ্কারাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছিল।
এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, নিহত ব্যক্তি স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা এবং যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও যুবদলের নেতা। ফলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত উভয় পক্ষই রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তি। প্রাথমিক তদন্তে দলীয় কোনো বিরোধ বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের তথ্য পাওয়া যায়নি। নিহতের ভাগ্নের বক্তব্য অনুযায়ী, মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। তিনি বলেন, কারা বিল্লাল হোসেনকে ছুরিকাঘাত করেছে, সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে মঙ্গলবার বেলা পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে বিল্লাল হোসেন তালুকদারের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে পুলিশ। বিল্লাল তালুকদারের বড় ছেলে হৃদয় হোসেন তালুকদার জানান, দুপুরে তার বাবার ময়নাতদন্ত ঢামেক হাসপাতালে সম্পন্ন হয়। পরে পুলিশ মরদেহ হস্তান্তর করে। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ায় দাফন করা হবে।