চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি: বাসস
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনা ঘিরে দ্বিতীয়বারের মতো উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া থেমে যাওয়ার পর এখন বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে। ৪ জুন চিঠি পাঠিয়ে প্রকল্পটির আইটিও নিয়োগের জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা ঘিরে এখন আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চট্টগ্রাম বন্দর।
মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা আসতে না আসতেই বিভিন্ন মহল থেকে ইজারার এই প্রক্রিয়া বাতিল করার দাবি উঠছে। বন্দরের এই অন্যতম টার্মিনালটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হলে বন্দর ও দেশ উভয় অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জানিয়ে ইজারার প্রক্রিয়া বাতিল করার দাবি জানিয়েছে ‘দেশ বাঁচাও বন্দর বাঁচাও আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। গতকাল রবিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় সংগঠনটি অচিরেই এই প্রক্রিয়া বাতিল করার দাবি জানায়। অন্যথায় কঠোর আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে সংগঠনটি। একই দাবি জানিয়েছেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা মো. হুমায়ুন কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এনসিটিসহ বন্দরের স্থাপনা বিদেশিদের কাছে ইজারা না দেওয়ার জন্য আমরা ফেব্রুয়ারি মাসে আন্দোলন করেছিলাম। আমাদের আন্দোলন কর্মসূচির কারণে ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এখন আবারও সেই প্রক্রিয়া চালুর নির্দেশনা দিয়েছে। সরকারের কাছে ইজারার এই প্রক্রিয়া বাতিল করার আবেদন জানাচ্ছি। এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ আমরা কোনোভাবে চাই না। আমরা সরকারকে এই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসার অনুরোধ জানাচ্ছি। অন্যথায় আমরা আবারও আন্দোলনে নামব।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদ সভায় শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের সবচেয়ে আধুনিক। নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে আয়বর্ধক এবং সবচেয়ে গতিশীল একটা বন্দর। এই বন্দরকে এই মুহূর্তে কারও কাছে ইজারা দেওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং এটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে পরিচালিত করছে। ভবিষ্যতেও এটা যেকোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালিত করবে। বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দিলে বন্দরের সার্বভৌমত্ব স্পর্শকাতর বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তাসহ বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের দেশ থেকে চলে যাবে। আমরা এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাব।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছ থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর ২০২৪ সালে তৎকালীন সরকার বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি শেষ করার আগে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর তারা বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যায়। এরপর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আলোচনা একটি পর্যায়ে এলে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি বন্দরে বিদেশ অপারেটর নিয়োগের বিরোধিতায় আন্দোলন শুরু করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ওই সময় শ্রমিক-কর্মচারীরা লাগাতর কর্মবিরতিসহ ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করেন। শ্রমিক-কর্মচারীদের লাগাতার আন্দোলনে অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর না করার ঘোষণা দেয়। সরকারের এই সিদ্ধান্তে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে আন্দোলন স্থগিত করেন শ্রমিকরা।
৪ জুন তিন ঘণ্টার ব্যবধানে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ প্রকল্প নিয়ে দুটি চিঠি পাঠায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। দুটি চিঠির প্রথমটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ দেওয়ার নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে সেক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া বাতিল করার জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় চিঠিতে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এই নির্দেশনার পর আন্দোলনকারী শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে আবারও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।