প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের বাজেট প্রস্তাবে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশের শিল্প উৎপাদন চাঙ্গা করা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করার লক্ষ্যে আগামী জাতীয় বাজেটে একগুচ্ছ ব্যবসা-বান্ধব পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাদের বাজেট প্রস্তাবে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।
যার মূল লক্ষ্য আগ্রাসী কর আদায়ের পরিবর্তে বাণিজ্য সহজীকরণ। এই নতুন কর সংস্কারের আওতায় প্রায় ৩৫০টি আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি (টিএফএ) এবং জাতীয় শুল্ক নীতি অনুসরণ করে এই শুল্ক যৌক্তিকীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৭০টি পণ্যের ওপর কাস্টমস ডিউটি বা আমদানি শুল্ক, ২১০টি পণ্যের ওপর রেগুলেটরি ডিউটি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক এবং ৬০টি পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তুতি চলছে।
তবে এই শুল্ক কমানোর ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো ধরনের অসম প্রতিযোগিতার মুখে না পড়ে, সে বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই সুবিধার আওতায় মূলত নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য, মসলা, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মনিটরের মতো তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন সামগ্রী, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, মাছ, মাংস এবং পরিবেশ-বান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) তৈরির কাঁচামাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
নতুন এই রূপরেখায় আইসিটি খাতের পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি বিনির্মাণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করবে। এছাড়া, দেশে নতুন প্রজন্মের পরিবেশ-বান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানির সুবিধার্থে সম্পূর্ণ নতুন ট্যারিফ স্ল্যাব এবং এইচএস কোড প্রবর্তন করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, উচ্চ আমদানি শুল্কের কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় শিল্পের উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল। আমদানিনির্ভর কাঁচামালের শুল্ক হ্রাস করলে স্থানীয় শিল্পগুলোর প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ব্যবহৃত অনেক পণ্যই বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না, তাই একটি আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এই খাতকে নীতিগত সহায়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার সহজ করা হলে তা বাংলাদেশের পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
শুল্ক হ্রাসের পাশাপাশি মূসক বা ভ্যাট ব্যবস্থার পরিপালন প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের স্বস্তিদায়ক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে আগামী অর্থবছর থেকে প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতার পরিবর্তে প্রতি তিন মাসে বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম চালু হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় সুখবর হচ্ছে স্থানীয়ভাবে কাঁচামাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে করের হার এক শতাংশ কমানোর পরিকল্পনা। নতুন নীতিমালায় করপোরেট করদাতাদের পরিশোধিত সম্পূর্ণ উৎসে করকে কর দায়ের সাথে সমন্বয়যোগ্য অথবা ফেরতযোগ্য করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। কোনো ব্যবসায়ী যদি পর পর তিন কর বছর ধরে এই অতিরিক্ত কর সমন্বয় করতে না পারেন, তবে তিনি সরাসরি তা ফেরত বা রিফান্ড দাবি করতে পারবেন। তবে এই রিফান্ড প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
মেট্রেপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির (এমসিসিআই)-এর সভাপতি কামরান টি চৌধুরী ভ্যাট রিটার্ন সহজীকরণের পদক্ষেপকে স্বাগত জানালেও ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত টার্নওভার ট্যাক্স বা ব্যবসায়িক লেনদেনের ওপর কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। তাঁর মতে, লাভ-ক্ষতি বিবেচনা না করে কেবল মোট বিক্রির ওপর কর আরোপ করা করনীতির মৌলিক সিদ্ধান্তের পরিপন্থী। একই সাথে তিনি তিন বছর অপেক্ষা না করে প্রতি বছরই অতিরিক্ত পরিশোধিত কর ফেরত বা সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই পুরো সংস্কার প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তি হচ্ছে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ব্যক্তি ও করপোরেট করদাতাদের করের হার সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া। এর ফলে দেশের কর ব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও পূর্বাভাসযোগ্যতা তৈরি হবে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ। কর কর্মকর্তাদের অন্যায্য কর আদায়ের চাপ থেকে ব্যবসায়ীদের মুক্ত রেখে একটি প্রীতিময় পরিবেশ সৃষ্টি করাই এখন সরকারের মূল অগ্রাধিকার।
ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা বলছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাপিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন খাতকে সুরক্ষা দেওয়ার এই নতুন অর্থনৈতিক দর্শন যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের শিল্পায়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।