পুশইন
সীমান্তের টানাপড়েন এখন কেবল কাঁটাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কূটনৈতিক সম্পর্কের সামনে একটি নতুন অস্বস্তি ও বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: বিবিসি
নিস্তব্ধ প্রহর। সুনসান নীরবতা। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে অমন গভীর রাতে নারী, শিশু ও পুরুষদের জোরপূর্বক বাংলাদেশ ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে ভারত। কিন্তু বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কড়া পাহারায় এ ধরনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দেশের উত্তর ও পশ্চিম সীমান্তজুড়ে এমন মানবিক সংকটের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক পুশইন বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে। ঢাকার দাবি, কোনো আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই লোকজনকে জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ভারত। অন্যদিকে দিল্লির ভাষ্য, তারা অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদেরই ফেরত পাঠাচ্ছে। সীমান্তের এই টানাপড়েন এখন কেবল কাঁটাতারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি দুই প্রতিবেশী দেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কূটনৈতিক সম্পর্কের সামনে একটি নতুন অস্বস্তি ও বড় ধরনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এমন একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই আজ সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবারের বৈঠকে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনার পাশাপাশি নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়া এই পুশইন ইস্যুটি অত্যন্ত জোরালোভাবে উত্থাপন করবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে পুশইন নিয়ে উদ্বেগ ক্রমাগত বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আট মাসে ২ হাজার ৭৯ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ১২০ জনকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছিল বিজিবি। সম্প্রতি শুধু মে মাসের শুরু থেকে কয়েকশ মানুষকে সীমান্ত দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলে বিজিবি দাবি করেছে।
খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন
গত কয়েক দিনে পঞ্চগড়, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মেহেরপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় একাধিক পুশইন চেষ্টার ঘটনা সামনে এসেছে। সম্প্রতি লালমনিরহাট সীমান্তে ৩৩ জনকে ঠেলে পাঠানোর অপচেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে বিজিবি। অমানবিক দৃশ্য দেখা গেছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার বড়বাড়ি-প্রধানপাড়া সীমান্তেও। সেখানে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টাকালে বিজিবির বাধার মুখে পড়ে টানা তিন দিন শূন্যরেখার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন নারী ও শিশুসহ ১০ জন। প্রচণ্ড রোদ আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যে শূন্যরেখার ফসলি জমির সরু আইলে তাদের দিন কাটছে। গত কয়েক দিনে একাধিকবার পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ভারত তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। নীলফামারী ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, ভারতীয় বিএসএফ কমান্ডারকে ওই ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বলা হলেও তারা রাজি হননি। ফলে বিজিবিও তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি।
অন্যদিকে নওগাঁ সীমান্তে পুশইন ঠেকাতে রাত্রিকালীন টহলে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম ব্যবহার করে কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে বিজিবি। মেহেরপুরের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তেও বিএসএফের ঠেলে দেওয়া ৬ জনের কোনো হদিস মিলছে না। ধারণা করা হচ্ছে, বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফ তাদের পুনরায় ভারতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে।
উদ্বেগ ভারতের মানবাধিকার সংগঠনেরও
সীমান্তের এই পুশইন নিয়ে খোদ ভারতের ভেতরই মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র অভিযোগ উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের প্রধান মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (এপিডিআর) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিএসএফ বন্দুকের ভয় দেখিয়ে নারী ও শিশুদের জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংগঠনটির সহসভাপতি রঞ্জিত শূর বলেছেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবে অবৈধ বিদেশি চিহ্নিত করার নামে এই অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর অনড় অবস্থানের কারণে এই মানুষগুলো শূন্যরেখায় আটকা পড়ে খাবার ও পানীয় জল ছাড়া অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছেন। গর্ভবতী নারী ও শিশুরাও এই অমানবিক পরিস্থিতির শিকার। তিনি অবিলম্বে ভারতের এই ‘পুশব্যাক’নীতি বাতিলের দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের (ইউএনএইচআরসি) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের পর্যবেক্ষণ, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সঙ্গে এই পুশইন বিতর্কের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অবৈধ অভিবাসন ইস্যু বহু বছর ধরে ভারতের রাজনীতিতে একটি স্পর্শকাতর বিষয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির মাঠ গরম রাখতে গিয়ে অনেক সময় পর্যাপ্ত নথিপত্র ছাড়াই বাংলাভাষী মানুষদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পুশইন করার চেষ্টা করা হয়।
তবে বাংলাদেশের অবস্থান এক্ষেত্রে অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সরকারের নীতি হলো, কোনো ব্যক্তি যদি প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রমাণিত হন, তবে তাকে ফিরিয়ে নিতে ঢাকার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সেক্ষেত্রে অবশ্যই দুই দেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত কনস্যুলার যোগাযোগ ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রশাসনিক, আইনি ও নিরাপত্তা জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করে ঢাকা।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পুশইনের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো দেশের নাগরিককে ফেরত পাঠাতে হলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। একতরফাভাবে কাউকে ঠেলে দেওয়া আস্থার সংকট তৈরি করে।
চীনে বাংলাদেশের আরেক সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি যাচাই ছাড়া কাউকে গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে আরও জটিলতা তৈরি হবে। আবার ভারতও যদি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে যায়, তাহলে তা দ্বিপক্ষীয় আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এটি কেবল সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও প্রতিষ্ঠিত যোগাযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতারও পরীক্ষা।’
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য, রেল ও সড়কপথে শক্তিশালী যোগাযোগ এবং জ্বালানি খাতে বিস্তৃত সহযোগিতা রয়েছে। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ এই সীমান্তে কেবল কাঁটাতার দিয়ে নয়, বরং দুই দেশের মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক সম্পর্কের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন সময়ে সীমান্তে এই একতরফা পুশইন বিতর্ক দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দিল্লিতে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া বিজিবি-বিএসএফ বৈঠক থেকে পারস্পরিক তথ্য বিনিময় ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই সমস্যার একটি স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান বেরিয়ে আসবেÑ এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট মহলের।