× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বসবাসের অযোগ্য কেন ঢাকা

ফারুক আহমাদ আরিফ ও রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ১ ঘণ্টা আগে

আপডেট : ১ ঘণ্টা আগে

অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে নগরায়ণের ফলে এবং সারা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত এখানেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে এই মহানগরীকে আর বাসোপযোগী রাখা যাচ্ছে না বলে মত একাধিক পানি বিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদের। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে নগরায়ণের ফলে এবং সারা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত এখানেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে এই মহানগরীকে আর বাসোপযোগী রাখা যাচ্ছে না বলে মত একাধিক পানি বিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদের। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বৃহস্পতিবার রাত ১১টা। ঝিরিঝিরি বাতাসে বেশ ঠান্ডা আমেজ লেগে আছে। কারণ কিছুক্ষণ আগে সামান্য বৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার গুলশান-২-এর সড়ক দিয়ে প্রাইভেটকারে তখন বাসায় ফিরছিলেন ৬৫ বছরের গোলাম মাওলা। ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করতে গাড়ির জানালা খুলে রেখেছিলেন তিনি।

কিন্তু হঠাৎই বিপত্তি বাধলÑ গুলশানের লেকের পানির তীব্র দুর্গন্ধ এমনভাবে তার নাকে এসে ধাক্কা দিল যে, শ্বাস নেওয়াই দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল।

শুধু গুলশান নয়; এমনকি হাতিরঝিল, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীসহ ঢাকার চারপাশের নদীর তীরে বসবাসকারীদেরও প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। এই ঢাকা নিয়েই গতকাল বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “ঢাকাকে আর বাসযোগ্য মনে হয় না।” তার ইচ্ছা করে ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বাস করতে। 

ঢাকা কেন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে? এ নিয়ে প্রতিদিনের বাংলাদেশ গতকাল কথা বলেছে একাধিক পানি বিশেষজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ ও পরিবেশবিদের সঙ্গে। তারা বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য করলেও মূল সুর মোটামুটি এই যে, অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে নগরায়ণের ফলে এবং সারা দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত এখানেই কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে এই মহানগরীকে আর বাসোপযোগী রাখা যাচ্ছে না।  

আজ থেকে ৪৭ বছর আগে বরিশাল থেকে ঢাকাতে পা রেখেছিলেন গোলাম মাওলা।

তিনি বললেন, “তখন ঢাকায় সতেজ নদী, গাছপালার সমারোহ ও পাখির কূজন ছিল। এখন সেই ঢাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়ে পড়েছে।”

বিবেকসম্পন্ন হয়ে কাজ করতে হবে

সকলেই যদি বিবেকসম্পন্ন হয়ে কাজ করে, তবেই কেবল ঢাকাকে বাসযোগ্য রাখা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. খলিলুর রহমান।

তিনি বলেন, “বাড়ি করার সময় যতটুকু জায়গা খালি রাখার বিধান আছে, সেখানে তা রেখে গাছপালা রোপণ করলেই চলে। কিন্তু কেউ তা রাখে না। পানি ড্রেনে যাওয়ার মতো পরিষ্কার রাখতে হয়। অথচ পলিথিন, ময়লা-আবর্জনা দিয়ে আমরা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট করে রাখি।”

তিনি বলেন, “এখানকার বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড, নাইট্রেডসহ এসব গ্যাস নিঃসরণ হচ্ছে। শব্দদূষণও মাত্রাতিরিক্ত। কেননা ৪০ ডেসিবেল শব্দ কানের জন্য সহনীয়, কিন্তু এখন ঢাকায় সেটি অনেক বেশি। এমনকি গ্রামের অবস্থাও তেমন ভালো নয়। এ অবস্থা চললে মানুষ তার কানের শোনার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকার এই করুণ পরিস্থিতির জন্য দায়ী আমাদের প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা। কেননা তারা সুপরিকল্পিত কোনো কাজ করছে না।”

ঢাকা হয়ে উঠেছে গ্যাস চেম্বার

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ ও বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করতে কেন্দ্রীয়ভাবে কেউ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এখানে মানুষের প্রবেশ ঘটেছে। প্রয়োজন না থাকলেও বিল্ডিং, রাস্তাঘাট নির্মাণ হয়েছে। জলাধার ধ্বংস হয়েছে।”

ঢাকাকে গ্যাস চেম্বারের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, “গত ৩০ বছরে ঢাকায় গড় তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি বেড়েছে। এমনকি স্থানভেদে যেমনÑ মতিঝিল, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ীতে ২-৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেড়েছে। এতে ঢাকা গ্যাস চেম্বারে পরিণত হয়েছে। এজন্য মূলত জলাধার কমে যাওয়া ও সবুজের বিনাশ এবং কাচের বিল্ডিং বিশেষভাবে দায়ী। তা ছাড়া শিল্প-কারখানা, যানবাহনের ধোঁয়াও অন্যতম দায়ী।”

আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, গত এক দশক ধরে ঢাকায় জুন মাসেও তাপপ্রবাহ হচ্ছে। এটি দিন দিন বাড়ছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রায় পার্থক্য দেখা দিচ্ছে। তা ছাড়া আগে যেখানে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও কোনো জলাবদ্ধতা হতো না; এখন সেখানে ৮০ মিলিমিটারেই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। কেননা মাটিতে পানি প্রবেশ করার মতো অবস্থা নেই। ফাঁকা জায়গা নেই। 

নদীতে জীবনধারণের পরিবেশ থাকে চার মাস

নদী গবেষক ও ‘রিভারাইন পিপল’-এর মহাসচিব শেখ রোকন বলেন, “ঢাকার চারপাশের নদীগুলো ফিজিক্যালি খানিকটা উদ্ধার হয়েছে। এখনও পুরাতন বুড়িগঙ্গার ১৬ কিমি উদ্ধার করা যায়নি। বছিলা, হযরতপুর পর্যন্ত এখনও দখলমুক্ত হয়নি। ফিজিক্যালি উদ্ধারের পাশাপাশি জৈবিকভাবেও করতে হবে।

“গবেষণা মতে, বর্ষা ও শরৎকালের ৪ মাস নদীতে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ থাকে। পানিতে জীব ও অনুজীবকে বাঁচতে হলে প্রতি লিটারে ৫ মিলিগ্রাম অক্সিজেন থাকতে হয়। সেখানে আষাঢ়-আশ্বিন ছাড়া বাকি ৮ মাসই থাকে ৫ গ্রামের ওপর। অর্থাৎ এ সময় পানিতে কোনো জীব-অনুজীব বাস করতে পারে না। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়; শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগেও এই অবস্থা।”

ড. আইনুন নিশাতের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ

ঢাকা দক্ষিণের জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং শহরকে বাসযোগ্য করে তুলতে ইমেরিটাস অধ্যাপক ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা ও সুপারিশ পেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “ঢাকা শহরকে ভবিষ্যতের অতিবৃষ্টি পরিস্থিতির জন্য এখনই প্রস্তুত করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ছে। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ৩০০ মিলিমিটার নয়, বরং ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি ভারী বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ড্রেনেজ ও নগর অবকাঠামোর সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হবে।”

কেবল নতুন পাম্প স্টেশন নির্মাণের ওপর নির্ভর না করে পানি যেন পাম্প স্টেশনে পৌঁছতে পারে, সেজন্য তিনি খাল-নালা ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশেষত ডিএনডি এলাকাসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ অঞ্চলের ক্যানেল নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার এবং শিমরাইল খালের মতো গুরুত্বপূর্ণ পানি চলাচলের পথ থেকে অবৈধ দখল ও প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর জোর দেন তিনি। 

ড. আইনুন নিশাত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, “২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় তৈরি করা ওয়ার্ডভিত্তিক ড্রেনেজ রিপোর্টসহ পূর্ববর্তী সকল গবেষণা প্রতিবেদন জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনা করতে হবে।”

প্রতিটি ওয়ার্ডের কোথায় পানি জমে, কোথায় ড্রেনেজজট রয়েছে বা কোথায় পাম্প ও খাল পুনরুদ্ধার দরকার তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে হালনাগাদ ওয়ার্ডভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করেন তিনি। 

তিনি বলেন, “প্রকল্পনির্ভর উন্নয়নের পরিবর্তে নির্মাণ, ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহিভিত্তিক একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প শেষ হওয়ার পর সেটির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোও থাকতে হবে।”

কেবল বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প না নিয়ে ঢাকার পূর্বাংশে পরিকল্পিত ফ্লাড এমব্যাংকমেন্ট, সড়ক এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোসমূহকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তিনি প্রকৃতিনির্ভর সমাধান এবং স্থানীয় পর্যায়ের অভিযোজন পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে ঢাকাকে জলবায়ু সহনশীল ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলারও প্রস্তাব দিয়েছেন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা