× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

গরিব পাবে খানিক স্বস্তি

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ৫ ঘণ্টা আগে

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ও রাজস্ব পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা কমাতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনায় প্রস্তাবিত বেশকিছু কর-সংক্রান্ত কঠোর পদক্ষেপ বাতিল করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) কঠোরতার বদলে একটু সুবিবেচক ও কোমল হতে পরামর্শ দিয়েছেন।

এর মধ্যে বহুল আলোচিত নতুন সম্পদ কর (ওয়েলথ ট্যাক্স) এবং অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করার বিতর্কিত সুবিধা পুরোপুরি বাতিলের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তরুণ ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর সম্পূর্ণ মওকুফের পাশাপাশি মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর নতুন কোনো কর আরোপ না করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রমতে, চলমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তা বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাবিতে এসব কর প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে কর প্রস্তাবগুলো নীতিগতভাবে অনুমোদন পেলেও তা কর ব্যবস্থার মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারেÑ এমন আশঙ্কায় বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে।  মূলত মাঠপর্যায়ের জনমত ও সাধারণ মানুষের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিয়েই সরকার তার রাজস্ব কৌশলে এই বড় রদবদল আনছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ফ্রিল্যান্সার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তরুণ কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের উৎসাহিত করতে তাদের আয়ের ওপর শতভাগ কর মওকুফের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত ডিজিটাল অর্থনীতি সচল রাখতে ভূমিকা রাখবে।

সম্পদ কর চালুর যে খসড়া প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল, তা মাঠপর্যায়ে কোনো প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া কার্যকর না করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মকর্তারা জানান, অতীতে বাংলাদেশে এই করব্যবস্থা আশানুরূপ ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এটি চালু করার পর একপর্যায়ে বাদ দেওয়া হয়। ফলে পূর্ণাঙ্গ প্রভাব মূল্যায়ন যাচাই ছাড়া এই কর প্রস্তাব কার্যকর হচ্ছে না। 

ব্যক্তি ও করপোরেট করদাতাদের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ বা রূপরেখা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম চার বছর করপোরেট করের বর্তমান কাঠামো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকবে এবং পঞ্চম বছরে গিয়ে তা সামান্য হ্রাস করা হতে পারে। ব্যবসায়ীদের জন্য আরেকটি বড় স্বস্তির খবর হলো, আগামী অর্থবছর থেকে আগাম বা ন্যূনতম উৎস কর কর্তনের ক্ষেত্রে রিফান্ড (অর্থ ফেরত) কিংবা সমন্বয়ের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। বর্তমানে কোম্পানিগুলোকে লাভ বা লোকসান নির্বিশেষে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম কর দিতে হয়, যা ব্যবসা লোকসানে চললেও ফেরত পাওয়া যায় না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক লোকসানের মুখে পড়লে পরিশোধিত করের বিপরীতে রিফান্ড বা কর সমন্বয়ের দাবি করতে পারবে। তবে অফশোর বা বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর পুনরায় আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, কালো টাকা সাদা করার ঢালাও সুযোগ বাতিল করার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। এ ধরনের সুবিধা কর ব্যবস্থার সততা নষ্ট করে এবং সৎকরদাতাদের কর প্রদানে নিরুৎসাহিত করে। তবে জরিমানা ও প্রচলিত কর পরিশোধ সাপেক্ষে অপ্রদর্শিত বৈধ আয় মূল অর্থনীতিতে আনার সুযোগ রাখা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।  

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে সম্পদ কর সরাসরি না থাকলেও ‘সম্পদ সারচার্জ’প্রথা চালু রয়েছে। তবে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্তরভিত্তিক নতুন সম্পদ করের যৌক্তিকতা সবসময়ই থাকে। সরকার হয়তো প্রস্তাবটির সামগ্রিক করের বোঝা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করার জন্য আরও কিছু সময় নিতে চাচ্ছে, যার কারণে এটি এখনই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

সম্প্রতি ১১০ সিসির ওপরের মোটরসাইকেলের ওপর প্রস্তাবিত আগাম আয়করের খবর জানাজানি হলে বাইক মালিক ও রাইড-শেয়ারিং চালকেরা এনবিআর ভবনের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। একই সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমেও এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা ছড়িয়ে পড়ে। জনমতের তীব্র চাপ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মুখে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে প্রস্তাবিত এই করের হার অর্ধেক করার কথা বললেও, পরবর্তীতে তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। 

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি আধুনিক সম্পদ করের প্রস্তাব তৈরি করেছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তৈরি করা কর প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত সরকারের উচ্চপর্যায়ে গৃহীত হয়নি।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০৩০-৩১ অর্থবছরকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিপর্যায়ের করমুক্ত আয়ের সীমার জন্য পাঁচ বছর মেয়াদি রোডম্যাপ উন্মোচন করার প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে করমুক্ত আয়ের ঊর্ধ্বসীমা ধাপে ধাপে সাড়ে চার লাখ টাকায় উন্নীত করা হতে পারে। 

এনবিআর সূত্র জানায়, গত বছরের বাজেটে ঘোষিত কাঠামোর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আগামী ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্য বর্তমান করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই বহাল রাখা হতে পারে। ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য এই সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের এই দীর্ঘমেয়াদি কর পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা। এনবিআরের সাবেক সদস্য ড. সৈয়দ মো. আমিনুল করিম এই উদ্যোগকে একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, কয়েক বছর আগে থেকে করমুক্ত আয়ের সীমা ঘোষণা করা হলে করদাতাদের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বর্তমানে যে হারে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তার তুলনায় এই প্রস্তাবিত সীমা হয়তো যথেষ্ট না-ও হতে পারে। 

কর বিশেষজ্ঞ ও এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশিষ বড়ুয়া এই অগ্রিম পরিকল্পনার প্রশংসা করলেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে এর সমন্বয় না থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বৈশ্বিক নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত দুই থেকে তিন বছরের জন্য এই ধরনের সীমা নির্ধারণ করা হয় এবং এর সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত করের ধাপগুলো অপরিবর্তিত বা লক করে রাখলে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে নাগরিকদের প্রকৃত সম্পদ না বাড়লেও তারা উচ্চ করের ধাপে পড়তে পারেন। এতে তাদের প্রকৃত ব্যয়যোগ্য আয় কমে যেতে পারে। তাই সব আয়ের ধাপেই মূল্যস্ফীতি-ভিত্তিক সমন্বয় থাকা জরুরি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা