ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৩ এএম
আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪২ এএম
এলজিইডি ভবন। ছবি: এলজিইডি
বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না সরকারের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই এ অধিদপ্তরকে ঘিরে শুরু হয়েছে নতুন এক আলোচনা। অনুমোদিত কোনো গ্রেডেশন লিস্টের তোয়াক্কা না করে ১৯৭ জন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়ায় বিষয়টিকে নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ নিয়ে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে এখন অধিদপ্তরে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। গতকাল সোমবার ভুক্তভোগী ও বঞ্চিত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে দেখা করে এ সম্পর্কে তাদের অভিযোগ ও বক্তব্যও তুলে ধরেছেন।
সূত্র জানাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে নির্বাহী প্রকৌশলীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ শূন্য থাকায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। শূন্য পদে দ্রুত জনবল নিয়োজিত করে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি আনার অজুহাতে অনেকটা তাড়াতাড়ি করেই একটি চক্রের ইন্ধনে ১৯৭ জন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রেডেশন লিস্ট চূড়ান্ত না করে কোন পদ্ধতির ভিত্তিতে এই পদোন্নতির তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। আইনের মারপ্যাঁচে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগও উঠেছে। বিক্ষুব্ধরা বলছেন, বড় অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে পদোন্নতির উপযুক্ত একটি অংশকে বাদ দিয়ে অনুগতদের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থার মধ্যেই এলজিইডি প্রকল্প থেকে বিধি-বহির্ভূতভাবে রাজস্ব খাতে নিয়োগকৃত ২৫৭ সহকারী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিতে এলজিইডির বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেন গত ১০ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে দাপ্তরিক পত্র পাঠান। সে সময় তিনি প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে দুই দফায় তালিকা পাঠান। চিঠিতে এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত ৫ম গ্রেডের নির্বাহী প্রকৌশলী বা সমমানের পদ চলতি দায়িত্বের মাধ্যমে পূরণের কথা উল্লেখ করা হয়। এ সময় গ্রেডেশন লিস্ট চূড়ান্ত করার পর সেটির তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর জন্য একটি পক্ষ বারবার করে অনুরোধ করলেও সুবিধাভোগী আরেকটি অংশ তাতে সাড়া দেয়নি।
প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) বেলাল হোসেনের পাঠানো চিঠির এক স্থানে বলা হয়েছে, ‘এলজিইডির সাংগঠনিক কাঠামোতে রাজস্ব বাজেটভুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলীর ১৬৮টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে শূন্য আছে ১১৪টি, যা জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী ৪৩ হাজার থেকে ৬৯ হাজার ৮৫০ বেতনক্রমের ৫ম গ্রেডের পদ। এ ছাড়া উন্নয়ন বাজেটভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পে নির্বাহী প্রকৌশলী বা উপ-প্রকল্প পরিচালক ও উপ-পরিচালকের পদ রয়েছে ১১২টি। এই ১১২টির মধ্যে ১৬টি পদ প্রেষণে পূরণ করা হয়েছে। সব মিলে বর্তমানে ২১০টি পদ শূন্য।’
প্রস্তাবের আরেক স্থানে এ বিষয়ে বলা হয়, ‘কর্মকর্তাদের যোগদানের ভিত্তিতে ইতঃপূর্বে ৩৩৩ জনের পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। ‘পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে মামলা’ চলমান থাকায় পদোন্নতি দেওয়া যায়নি। পদগুলো দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে বিধায় ‘চলতি দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে পূরণ করার বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য। প্রস্তাবিত শূন্য পদগুলোর কারণে বিভাগ, অঞ্চল ও সদর দপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।’
ভুক্তভোগী একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষয়টি নিয়ে একটি গ্রুপ অনেক দিন ধরেই সক্রিয় ছিল। এলজিইডি ভবনে ‘জামাল গ্রুপ’ হিসেবে পরিচিত মো. জামাল উদ্দিন, আবুল হায়াৎ ও শফিকুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন আছেন, যারা এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ঐতিহাসিক নীতিমালার সাক্ষী হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। ২০১২ সালে পরীক্ষা দিয়ে ২০১৩-তে এলজিইডিতে যোগদান। ২০১২ সালের পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি নেওয়া হয়নি। সেই সময়কার জামাল গ্রুপ এলজিডি প্রশাসনকে ম্যানেজ করে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। জামাল উদ্দীন চিফ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার অসুস্থ চিন্তায় বিভোর হয়ে এভাবে তার পরিকল্পনার প্রথম ধাপ পূরণ করেন। দ্বিতীয় ধাপে অর্থের বিনিময়ে ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে ফাউন্ডেশন ট্রেনিংয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তার আগে যোগ দেওয়া ও ফাউন্ডেশন ট্রেনিং সমাপ্ত করা গ্রুপকে পিছনে ফেলার পাঁয়তারাও করেন। প্রশাসনের সহযোগিতায় মামলা করে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী প্রমোশন আটকে দেন এবং গ্রেডেশন লিস্টের নামে নিয়োগবিধির কিছু দুর্বল দিক বের করে তাদের আগে নিয়োগ হওয়া একটি গ্রুপকে ২০২৪ সালের খসড়ায় পিছনে পাঠিয়ে দেন। যদিও ২০০৮ সালের পরে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে চূড়ান্ত বা প্রকাশিত কোনো ধরনের গ্রেডেশন লিস্ট করা নেই। এরপর ২০২৬ সালে নির্বাহী প্রকৌশলী চলতি পদে পদায়িত হয়ে তিনি পরবর্তী ধাপ পূরণ করেন। সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী দায়িত্ব পালন করছেনÑ এমন অনেক প্রকৌশলী যাতে নির্বাহী প্রকৌশলী চলতি দায়িত্ব পদ পেতে না পারেন, সে ব্যবস্থাও করেন তিনি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সাল পর্যন্ত জামাল উদ্দীন এলজিডিতে তার আত্মীয়তার জোরে উচ্চ বেতনে প্রজেক্টে চাকরি করেন। এলজিডিতে ঢোকার পরপরই তিনি বড় একটি উপজেলার দায়িত্ব নেন এবং দুর্নীতির মাধ্যমে প্রচুর অর্থ জমা করেন। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য জামাল উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি সাড়া দেননি। পরিচয় দিয়ে এসএমএস করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
গ্রেডেশন লিস্ট চূড়ান্ত না করে পদোন্নতির উদ্দেশ্যে তালিকা পাঠানো নিয়ে বিতর্ক ছিল বলে জামাল গ্রুপের এক সদস্য প্রতিদিনের বাংলাদেশের কাছে স্বীকার করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘ গ্রেডেশন করে এগোনোর জন্য বারবার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারণ কিসের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হলো তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক জারি করা প্রজ্ঞাপনে এজিইডির সহকারী প্রকৌশলীদের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা মূলত চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বজায় রাখার প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে করা হয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন মতামত ও প্রতিক্রিয়ার বিষয়েও আমরা অবগত রয়েছি।’ তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রকৌশলী তার দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ করে তাদের অবস্থানও তুলে ধরেছেন। তাদের বক্তব্য তিনি মনযোগ দিয়ে শুনেছেন। বিষয়টি সার্বিকভাবে পর্যালোচনার আওতায় রয়েছে বলে জানান তিনি।
সচিব বলেন, ‘সরকার সব সময়ই একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং নীতিনির্ভর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে। সেই আলোকে, প্রাসঙ্গিক নীতিমালা ও বিধিবিধানসমূহ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট সকলেই বিষয়টি নিয়ে সংযম ও পেশাদারত্ব বজায় রাখবেন।’
এই বিষয়ে সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী, প্রশাসন, (চলতি দায়িত্ব)(এইচ কিউ) শফিকুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনিয়মের যে অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই যুক্ত নই। এখানে যাদের এসিআর জমা দেওয়া ছিল না, পদোন্নতি থেকে শুধু তারাই বাদ পড়েছেন। বাদ পড়াদের অনেকেই এখন এসিআর জমা দিচ্ছেন। যারা এসিআর-এর কারণে বাদ পড়েছেন তারা সবাই পদোন্নতি পাবেন বলে আশা করছি।’ বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তিনি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেনের বক্তব্য নিতে গতকাল সোমবার তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।