ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬ ১১:১৯ এএম
কারাগার। প্রতীকী ছবি
বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই কারাগার মূলত দণ্ডপ্রাপ্তদের শাস্তি কার্যকরের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী অপরাধ ও বিচারব্যবস্থার ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। পরিবর্তনের সেই ধারায় বর্তমানে জোর ও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে অপরাধীদের পুনর্বাসন, সংশোধন এবং মানবিক ব্যবস্থাপনার ওপর। এমন প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ জেল’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশান সার্ভিস’ করার প্রস্তাব আনা হয়েছে। বাংলায় এর নাম হবে ‘বাংলাদেশ হেফাজত ও সংশোধনাগার’।
সোমবার দুপুর ২টায় সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এটিই নতুন সরকারের প্রথম প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির বৈঠক। সেখানে এ প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে। এ ছাড়া পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামো ও কোস্ট গার্ডে পরিবর্তন আনা হবে। এ নিয়েও এ বৈঠকে আলোচনা হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবরা উপস্থিত থাকবেন।
শুধু আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়, নীতিগত অবস্থান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ‘বাংলাদেশ জেল’ পরিবর্তন এনে নতুন ‘বাংলাদেশ হেফাজত ও সংশোধনাগার’ নামটি শুধু আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি একটি নীতিগত অবস্থান। যেখানে অপরাধীকে কেবল শাস্তি দেওয়ার মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যপরিধি সীমিত থাকবে না, বরং নিরাপদ হেফাজত নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণ, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা ও প্রেষণার মাধ্যমে সমাজে তাকে পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সভাপতিত্বে এ-সংক্রান্ত একটি বৈঠক হয়। দীর্ঘদিনের আলোচনা-পর্যালোচনার পর অবশেষে এটি প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যসূচিতে আনা হয়েছে। চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের জন্য এটি সভার এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারাগার ব্যবস্থাকে মানবিক ও আধুনিকায়নের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু নাম বদল নয়, বাস্তব সংস্কারÑ যেমন, বন্দিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কর্মসূচির সম্প্রসারণ হলেই এ উদ্যোগ অর্থবহ হবে। নতুন সরকারের প্রথম সচিব কমিটির আলোচ্যসূচির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে উঠে এসেছে কারাগার ব্যবস্থার নাম ও দর্শনে পরিবর্তন এবং পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় রদবদল। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, একদিকে ‘বাংলাদেশ জেল’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ কাস্টোডিয়াল অ্যান্ড কারেকশান সার্ভিস’ এবং বাংলায় ‘বাংলাদেশ হেফাজত ও সংশোধনাগার’ করার প্রস্তাব; অন্যদিকে চার হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) পদ সৃজনের পাশাপাশি ৪ হাজার কনস্টেবল পদ বিলুপ্তির উদ্যোগÑ দুটি সিদ্ধান্তই দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পুলিশে পদ সৃজন ও বিলোপ
সভায় পুলিশের কাঠামোয় পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হবে। বিভিন্ন ইউনিটের বিপরীতে ৪ হাজার এএসআই (নিরস্ত্র) (গ্রেড-১৪) পদ রাজস্ব খাতে অস্থায়ীভাবে সৃজন এবং সমসংখ্যক ৪ হাজার কনস্টেবল পদ বিলুপ্ত করা হবে।
সূত্র জানায়, এএসআই পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি/সমমান নির্ধারণ করে দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুরুতে মোট আট হাজার এএসআই পদের প্রস্তাব করা হয়েছিলÑ এর মধ্যে ৪ হাজার সরাসরি নিয়োগযোগ্য এবং ৪ হাজার বিভাগীয় পদোন্নতিযোগ্য। ৫০০ নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও প্রস্তাবে ছিল। ইতোমধ্যে ৪ হাজার এএসআই পদের সরকারি আদেশ (জিও) জারি হয়েছে। এখন অবশিষ্ট ৪ হাজার পদ সৃজনের পাশাপাশি পদোন্নতির ধারাবাহিকতায় ৪ হাজার কনস্টেবল পদ বিলুপ্তির প্রস্তাব অনুমোদনের পথে। অর্থ বিভাগ শর্তসাপেক্ষে এতে সম্মতি দিয়েছে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও কনস্টেবল পদ বিলুপ্তিতে সম্মতি দিয়েছে।
ইমার্জেন্সি কল সেন্টার ও টেলিকমে ৭৩ পদ
বাংলাদেশ পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত পুলিশ টেলিকম সংস্থার ইমার্জেন্সি কল সেন্টারের কার্যক্রম জোরদারে ৭৩টি পদ সৃজনের প্রস্তাবও সভায় উপস্থাপন হবে। প্রাথমিকভাবে ১০০টি পদের প্রস্তাব করা হলেও অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ ৭৩টি পদে সম্মতি দিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও সম্মতি জানিয়েছে এবং এসব পদের বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিজিটাল যুগে জরুরি সেবা ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পদ্মা সেতু এলাকায় নতুন থানায় পদ সৃজন : শরীয়তপুর জেলার পদ্মা সেতু (দক্ষিণ) থানা এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার পদ্মা সেতু (উত্তর) থানার কার্যক্রম পরিচালনায় পৃথকভাবে ৯টি করে অস্থায়ী পদ সৃজনের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে বাণিজ্য, যাতায়াত ও জনচলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে।
কোস্ট গার্ডে নতুন বোট, সীমিত পদ
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সাংগঠনিক কাঠামোয় জাইকার অর্থায়নে ২৪টি রেসকিউ বোট এবং ইউএনওডিসি-জিএমসিপির অনুদানে একটি ট্রেনিং বোট যুক্ত হয়েছে। এগুলো পরিচালনায় অর্থ বিভাগ ৪২টি পদ সৃজনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে। যার মধ্যে ৪০টি সামরিক এবং ২টি বেসামরিক পদ। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, উদ্ধার অভিযান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারে এসব বোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস
সামগ্রিকভাবে সচিব কমিটির এই বৈঠকের আলোচ্যসূচি ইঙ্গিত দিচ্ছে, নতুন সরকার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে দক্ষতা ও আধুনিকায়নের দিকে যেতে চায়। কারাগারের নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট করা, পুলিশের মধ্যস্তরকে শক্তিশালী করা, জরুরি সেবায় প্রযুক্তিনির্ভর জনবল বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো-কেন্দ্রিক থানায় পদ সৃজনÑ সব মিলিয়ে এটি একটি কাঠামোগত পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ।
তবে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর বাস্তবায়নই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কারাগার ব্যবস্থায় ‘সংশোধন’ দর্শন কার্যকর করতে হলে বাজেট, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং মনস্তাত্ত্বিক সেবাÑ সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। আগামীকালের বৈঠক শেষে সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হলে প্রশাসনিক সংস্কারের এ ধারার প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হবে। তবে আলোচ্যসূচি থেকেই ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে কারাগারের প্রশাসন সংশোধনমুখী ও দক্ষতানির্ভর হয়ে উঠছে।